উদ্ভিদের সাড়াপ্রদান এবং রাসায়নিক সমন্বয় - হরমোন

উদ্ভিদ দেহের বিভিন্ন কাজের নিয়ন্ত্রণের প্রয়জোনীয়তা এবং হরমোনের ভূমিকা

উদ্ভিদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি, পরিস্ফুটন, সাড়া প্রদান , জনন এবং সর্বোপরি সমগ্র ক্রিয়াকলাপের নিয়ন্ত্রণ ও সমন্বয় সাধনের জন্য নিমিত্ত খাদ্যের সকল প্রকার উপাদান ছাড়াও খুব অল্প পরিমাণে একপ্রকার জৈব পদার্থের প্রয়োজন হয় । শারীরবৃত্তীয় কার্য সহায়ককারী এই জৈব পদার্থটিকে উদ্ভিদ হরমোন বা ফাইটোহরমোন বা বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রক পদার্থ বলে । জীবদেহে একটি নির্দিষ্ট স্থান থেকে হরমোন উৎপন্ন হয়ে ধীরে ধীরে সারা দেহের কোশগুলিতে ছড়িয়ে পড়ে এবং কোশের বিক্রিয়াগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করে ।   হরমোন এইভাবে জীবদেহে রাসায়নিক সংযোগ গড়ে তোলার জন্য হরমোনকে রাসায়নিক সমন্বয়কারী বা রাসায়নিক সমন্বায়ক  (Chemical coordinator) বলে।

হরমোলের বৈশিষ্ট্য︓ হরমোন খুব সূক্ষ্ম মাত্রায় ক্রিয়াশীল হয় । প্রয়োজনের চেয়ে কম বা বেশি ক্ষরিত হলে দেহের শারীরবৃত্তীয় ক্রিয়ায় বিঘ্ন ঘটায় । কার্য সমাপ্তির পর হরমোন ধ্বংস হয়ে যায় এবং দ্রুত শরীর থেকে নির্গত হয়।

বিজ্ঞানী বেলিস ও স্টারলিং ( Bayliss and Starling ) 1905 খ্রিস্টাব্দে এই রাসায়নিক সমন্বায়ক ( chemical coordinator ) পদার্থটিকে হরমোন ( Hormone ) নামে অভিহিত করেন। হরমোন শব্দটি গ্রিক শব্দ হরমাও ( Hormao ) থেকে উৎপত্তি, যার অর্থ হল জাগ্রত করা বা উত্তেজিত করা। 1881 খ্রিস্টাব্দে চার্লস ডারউইন ( Charles Darwin ) এর আলোকবৃত্তি পরীক্ষা থেকে উদ্ভিদদেহে হরমোনের উপস্থিতি কথা প্রথম জানা যায়। পরবর্তীকালে বিজ্ঞানী ভেন্ট ( Went, 1928 ) যই নামক উদ্ভিদের মুকুলাবরণী থেকে অক্সিন ( Auxin ) নামক হরমোন আবিষ্কার করেন। জীবদেহের নির্দিষ্ট স্থান থেকে হরমোন উৎপন্ন হয়ে সারাদেহের কোশগুলিতে ছড়িয়ে পড়ে এবং কোশের সকলপ্রকার শারীরবৃত্তীয় ক্রিয়াকলাপ নিয়ন্ত্রণ করে। উদ্ভিদদেহের বৃদ্ধি সহায়ক উপাদানরূপে হরমোন নানা কাজ করে। যেমন — অগ্র ও পার্শ্বীয় কাণ্ড এবং মুকুল বৃদ্ধি, কোশ বিভাজন, ফুল ফোটানো, মুকুলোদ্‌গম, বীজের অঙ্কুরোদগম এবং ট্রপিক চলন নিয়ন্তন করে।

হরমোন ( Hormone ) : যে জৈব রাসায়নিক পদার্থ বিশেষ কোশসমষ্টি বা অন্তঃক্ষরা গ্রন্থিকোশ থেকে নিঃসৃত হয়ে দেহতরলের মাধ্যমে বা ব্যাপন ক্রিয়ায় উৎপত্তিস্থল থেকে দূরে বাহিত হয়ে কোশের বিপাকীয় ক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে এবং ক্রিয়ার পর ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়, তাকে হরমোন বা রাসায়নিক সমন্বায়ক বলে। 

হরমোন ও উৎসেচকের পার্থক্য ( Differences between Hormone and Enzyme )

হরমোন উৎসেচক
1. হরমোন অনাল গ্রন্থির কোশে উৎপন্ন হয়। 1. উৎসেচক সমস্ত সজীব কোশে উৎপন্ন হয়।
2. হরমোন সাধারণত উৎসস্থলে ক্রিয়া করে না ( ব্যতিক্রম– লোকাল হরমোন )। 2. উৎসেচক উৎপত্তিস্থলে ও অন্যত্র ক্রিয়া করে।
3. হরমোন ক্রিয়ার পর ধ্বংস হয়ে যায়। 3. উৎসেচক ক্রিয়ার পর ধ্বংস হয় না।

উদ্ভিদ হরমোনের বৈশিষ্ট্য ( Characteristics of Plant Hormones )

উদ্ভিদ হরমোনের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি হল—
  1. উৎস ( Sources ) : উদ্ভিদ হরমোন প্রধানত কাণ্ড ও মূলের অগ্রস্থ ভাজক কলা থেকে উৎপন্ন হয় । এ ছাড়া ভ্রণমুকুল, রণমুকুল আবরণী, বীজপত্র, মুকুলিত পত্র, সস্য, ফল ইত্যাদিও উদ্ভিদ হরমোনের উৎসস্থল।
  2. পরিবহণের ধরন ( Modes of transport ) : উদ্ভিদ হরমোন ব্র্যাপন প্রক্রিয়ায় কোশ থেকে কোশাস্তরে বাহিত হয় । জাইলেম ও ফ্লোয়েম কলার মাধ্যমে উদ্ভিদ হরমোন বাহিত হয় ।
  3. কাজ ( Function ) :
    ( a ) উদ্ভিদ হরমোন উদ্ভিদের কোশে কোশে রাসায়নিক সমন্বয় সাধন করে ।
    ( b ) হরমোন উদ্ভিদের বিপাক ক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে ।
    ( c ) উদ্ভিদের বৃদ্ধি ও কোশবিভাজন নিয়ন্ত্রণ করে ।
    ( d ) উদ্ভিদ হরমোন ফুলের উৎপত্তি ও পরিস্ফুটন, পরিণতি এবং যৌন বৈশিষ্ট্য প্রকাশে সহায়তা করে ।
  4. পরিণতি ( Fate ) : উদ্ভিদ হরমোন ক্রিয়ার পর ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়–
    ( i ) অক্সিন আলোর উপস্থিতিতে বা ইন্ডোল অ্যাসেটিক অ্যাসিড অক্সিডেজ উৎসেচকের ক্রিয়ায় বিনষ্ট হয় ।
    ( ii ) জিব্বেরেলিন জিব্বেরেলিক অ্যাসিড অক্সিডেজের প্রভাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় ।
    ( iii ) সাইটোকাইনিন সাইটোকাইনিন অক্সিডেজ উৎসেচকের ক্রিয়ায় ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় ।

উদ্ভিদ হরমোনের প্রকারভেদ ( Types of plant hormone )

উদ্ভিদ হরমোনকে প্রধান তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে, যথা —1 . অক্সিন , 2. জিব্বেরেলিন , 3. সাইটোকাইনিন ।
1. অক্সিন ( Auxin – C10H9O2N ) :

অক্সিন - এর রাসায়নিক নাম ইন্ডোল অ্যাসেটিক অ্যাসিড ( IAA )

সংজ্ঞা ( Definition ) : উদ্ভিদের কাণ্ড ও মূলের অগ্রভাগে , ভ্রুণমুকুলাবরণী , বর্ধনশীল পাতার কোশে সংশ্লেষিত নাইট্রোজেনঘটিত যে জৈব অম্ল উদ্ভিদের বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করে , তাকে অক্সিন বলে ।
উৎস ( Origin ) : অক্সিনের মূল উৎস হল কাণ্ড ও মূলের অগ্রভাগ , ভ্রুণমুকুলাবরণী , বর্ধনশীল পাতার কৌশ — এবং ফল ।
রাসায়নিক উপাদান ( Chemical Constituents ) : অক্সিনের রাসায়নিক উপাদান হল — কার্বন ( C ) , হাইড্রোজেন ( H ) , অক্সিজেন ( O ) এবং নাইট্রোজেন ( N ) ।
ভূমিকা ( Role ) :

  1. অগ্রস্থ প্রকটতা ( Promotes apical dominance ) : অক্সিন অগ্রস্থ প্রকটতা ঘটায় এবং পার্শ্বীয় মুকুলের বৃদ্ধি ব্যাহত করে । অগ্রমুকুলের উপস্থিতিতে কাক্ষিক মুকুলের বৃদ্ধি বাধাপ্রাপ্ত হয়, কিন্তু অগ্রমুকুল কেটে বাদ দিলে কাক্ষিক মুকুলের বৃদ্ধি ঘটে এবং শাখাপ্রশাখা সৃষ্টি হয় । এই শারীরবৃত্তীয় ঘটনাকে অগ্রস্থ প্রকটতা বলে ।

  2. কোশবিভাজন ও কোশের আকার বৃদ্ধি ( Cell division and cell enlargement ) : অক্সিনের প্রভাবে উদ্ভিদকোশ বিভাজিত হয় এবং কোশ আয়তনে বৃদ্ধি পায় ( অক্সিন কোশপ্রাচীরকে নমনীয় করে এবং কোশপ্রাচীরে নতুন উপাদান সঞ্চিত করে কোশের সামগ্রিক বৃদ্ধি ঘটায় । এ ছাড়া কোশগহ্বর ( vacuole ) সৃষ্টি করে অক্সিন কোশের আয়তন বৃদ্ধি ঘটায় )
  3. মূলের বৃদ্ধি ( Root growth ) : লঘু ঘনত্বের অক্সিন মূলের বৃদ্ধিতে সাহায্য করে ।
  4. ফলের বৃদ্ধি ( Fruit growth ) : পরাগযোগ ও নিষেকের পর ডিম্বাশয়ে অক্সিনের পরিমাণ বেড়ে যায় । এই কারণে ডিম্বাশয় ফলে পরিণত হয় । অক্সিনের প্রভাবে নিষেক ছাড়াও ডিম্বাশয় ফলে পরিণত হয় । এই ধরনের ফল বীজবিহীন হয় । অক্সিনের প্রভাবে বীজবিহীন ফল সৃষ্টি হওয়াকে পার্থেনোকাপি ( parthenocarpy ) বলে । অক্সিনের সঠিক পরিমাণে ফল আয়তনে বৃদ্ধি পায় ।
  5. ট্রপিক চলন নিয়ন্ত্ৰণ ( Control of tropic movement ) : অক্সিন উদ্ভিদের ফোটোট্রপিক এবং জিওট্রপিক চলন নিয়ন্ত্রণে বিশেষ ভূমিকা গ্রহণ করে ( কাণ্ডে অক্সিন আলোর উৎসের বিপরীত দিকে বেশিমাত্রায় সঞ্চিত হয়ে ওই অঞ্চলের কোশগুলির দ্রুত বিভাজন ঘটায় , ফলে উদ্ভিদের কাণ্ড আলোর উৎসের দিকে বেঁকে যায় । মূল স্বল্প পরিমাণ অক্সিনে বেশি অনুভূতিশীল । মূলের ক্ষেত্রে আলোর উৎসের দিকে কোশগুলিতে অক্সিনের উপস্থিতি খুব কম, সেইজন্য ওই অঞ্চলের কোশ দ্রুত বিভাজিত হয় । ফলে মূল আলোর বিপরীত দিকে বেঁকে যায় । অধিক ঘনত্বের অক্সিনে বিটপ অনুভূতিশীল এবং কম ঘনত্বের অক্সিনে মূল অনুভূতিশীল । কাণ্ডের অগ্রভাগে অধিক ঘনত্বের অক্সিন এবং মূলের অগ্রভাগে কম ঘনত্বের অক্সিন সঞ্চিত হয়ে যথাক্রমে কাণ্ড ও মূলের অগ্রভাগে দ্রুত কোশ বিভাজন ঘটায় । ফলে বিটপ অভিকর্ষের বিপরীতে এবং মূল অভিকর্ষের অনুকূলে অগ্রসর হয় । অক্সিন এইভাবে উদ্ভিদের জিওট্রপিক চলন নিয়ন্ত্রণ করে । অক্সিনের এইরকম অসমান বণ্টনের ওপর উদ্ভিদের ট্রপিক চলন নির্ভর করে ।

ফ্লোরিজেন একপ্রকারের প্রকল্পিত হরমোন , যা গাছের ফুল ফোটায় । ইথিলিন একপ্রকারের গ্যাসীয় হরমোন , যা ফল পাকাতে সাহায্য করে ।

2. জিব্বেরেলিন ( Gibberellin – C19H22O6 ) :

অক্সিনের মতো জিব্বেরেলিনও উদ্ভিদের বৃদ্ধি সহায়ক হরমোন । 1921 খ্রিস্টাব্দে ক্যুরোশোয়া ( Kurosawa ) প্রথম জিব্বেরেলা ফুজিক্যুরই ( Gibberella fuzikuroi ) নামক ছত্রাকে এই হরমোনের উপস্থিতি লক্ষ করেন । জিব্বেরেলিনের রাসায়নিক নাম জিব্বেরেলিক অ্যাসিড ( GA ) ।
সংজ্ঞা ( Definition ) : উদ্ভিদের পরিপক্ক বীজ, অঙ্কুরিত চারাগাছ, বীজপত্র, মুকুল ইত্যাদিতে সংশ্লেষিত টারপিনয়েড গোষ্ঠীর যে জৈব অম্ল উদ্ভিদের দৈর্ঘ্যের বৃদ্ধি ঘটায় এবং বীজের সুপ্ত দশা হ্রাস করে এবং ফুল ধারণে সাহায্য করে তাকে জিব্বেরেলিন বলে ।
উৎস ( Origin ) : জিব্বেরেলিন উদ্ভিদের পরিপক্ব বীজে , মুকুল , অঙ্কুরিত চারাগাছ , বীজপত্র , বর্ধিয়ু পাতায় সংশ্লেষিত হয় ।
রাসায়নিক উপাদান ( Chemical Constituents ) : জিব্বেরেলিন নাইট্রোজেনবিহীন হরমোন , যার রাসায়নিক উপাদান হল কার্বন ( C ) , হাইড্রোজেন ( H ) ও অক্সিজেন ( O ) ।
ভূমিকা ( Role ) :

  1. মুকুল ও বীজের সুপ্তাবস্থা ভঙ্গ ( Breaks seed and bud dormancy ) : জিব্বেরেলিন বীজ ও মুকুলের সুপ্তাবস্থা ভঙ্গ করতে সক্ষম । যে সমস্ত বীজে ও মুকুলে স্বল্প অন্তর্জনিয়ু ( endogenous ) জ্বিব্বেরেলিন থাকে , সেক্ষেত্রে বহির্জনিয়ু ( exogenous ) জিব্বেরেলিন প্রয়োগে বীজ ও মুকুলের সুপ্তাবস্থা ভঙ্গ করা যায় ।


  2. পর্বমধ্যের দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি ( Elongation of internodes ): জিব্বেরেলিনের প্রভাবে উদ্ভিদের পর্বমধ্যগুলির সংখ্যা বৃদ্ধি না ঘটে দৈর্ঘ্যে বৃদ্ধি ঘটে ফলে উদ্ভিদদেহ অতিশয় লম্বা হয় ।
  3. ফলের বৃদ্ধি ( Fruit growth ): ফল গঠন ও ফলের বৃদ্ধিতে জিব্বেরেলিনের বিশেষ ভূমিকা আছে । আঙুর , আপেল , নাসপাতি প্রভৃতি উদ্ভিদের ফল গঠনে এবং ফলের বৃদ্ধিতে বিশেষ ভূমিকা নেয় । বিজ্ঞানী ডেনিস ও নিটস ( Denis and Nitch ) 1996 খ্রিস্টাব্দে জিব্বেরেলিনের প্রভাবে আপেলে বীজবিহীন ফল উৎপাদনের কথা উল্লেখ করেন ।
3. সাইটোকাইনিন ( Cytokinin – C10H9ON5 ) :

সাইটোকাইনিন বা কাইনিন পিউরিন জাতীয় নাইট্রোজেনঘটিত ক্ষারীয় জৈব পদার্থ ।
সংজ্ঞা ( Definition ) : ফল ও বীজের মধ্যে সংশ্লেষিত পিউরিন জাতীয় নাইট্রোজেনঘটিত যে ক্ষারীয় জৈব পদার্থ কোশ বিভাজনকে উদ্দীপিত করে , তাকে সাইটোকাইনিন বলে ।
উৎস ( Origin ) : সাইটোকাইনিন উদ্ভিদের ফল ও সস্যে সংশ্লেষিত হয় । নারকেলের তরল সস্যে ( ডাবের জলে ) , টম্যাটোর রসে , ভুট্টার সস্যে অধিক পরিমাণে পাওয়া যায় ।
রাসায়নিক উপাদান ( Chemical Constituents ) : এটি কার্বন , হাইড্রোজেন , অক্সিজেন ও নাইট্রোজেন নামক রাসায়নিক উপাদানে গঠিত ।
ভূমিকা ( Role ) :

  1. কোশ বিভাজন ঘটানো ( Promotes cell division ) : সাইটোকাইনিন উদ্ভিদের কোশ বিভাজনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে । গুটম্যান ( Guttman , 1956 ) -এর মতে পেঁয়াজ ও মটরের মূলে সাইটোকাইনিন প্রয়োগে দ্রুত কোশ বিভাজন ঘটে।  ব্রাউন ও উড ( Brown and Wood , 1967 ) নয়নতারা উদ্ভিদে সাইটোকাইনিন প্রয়োগ করে টিউমার কলা সৃষ্টি করেন ।
  2. পার্শ্বীয় মুকুলের বৃদ্ধি ঘটানো ( Promotes lateral bud ) : সাইটোকাইনিন উদ্ভিদের অগ্রমুকুলের বৃদ্ধি হ্রাস ঘটিয়ে পার্শ্বীয় মুকুলের বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করে । তাই গাছের শাখাপ্রশাখা সৃষ্টি হয়ে গাছ ক্রমশ গম্বুজাকার ধারণ করে ।
  3. পত্রমোচন বিলম্বিত করা ( Delay leaf sene scence ) : সাইটোকাইনিনের প্রভাবে পত্রমোচন বিলম্বিত হয় এবং পাতার ক্লোরোফিল নষ্ট হওয়াকে রোধ করে, ফলে গাছ অনেকদিন চির সবুজ থাকে, অর্থাৎ উদ্ভিদের বার্ধক্য বিলম্বিত হয় ।

অক্সিন, জিব্বেরেলিন ও সাইটোকাইনিনের প্রধান পার্থক্য ( Differences among Auxin , Gibberellin and Cytokinin )

বিষয় অক্সিন জিব্বেরেলিন সাইটোকাইনিন
উৎস কাণ্ড ও মূলের অগ্রস্থ ভাজক কলা বীজপত্র, পরিপক্ক বীজ, মুকুল ইত্যাদি উদ্ভিদের ফল ও শস্য
রাসায়নিক উপাদান কার্বন, হাইড্রোজেন, অক্সিজেন ও নাইট্রোজেন কার্বন, হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন কার্বন, হাইড্রোজেন, অক্সিজেন ও নাইট্রোজেন
রাসায়নিক প্রকৃতি ইন্ডোল বর্গযুক্ত টরপিনয়েড বর্গযুক্ত পিউরিন জাতীয় ক্ষারীয় জৈব পদার্থ
পরিবহণ নিম্নমুখী উভমুখী সবদিকে
ট্রপিক চলন সাহায্য করে কোনো ভূমিকা নেই কোনো ভূমিকা নেই
মুকুল ও বীজের সুপ্ত অবস্থা ভঙ্গ এরকম কোনো ভূমিকা নেই মুকুল ও বীজের সুপ্ত অবস্থা ভঙ্গ করে এরকম কোনো ভূমিকা নেই

সংশ্লেষিত হরমোন বা কৃত্রিম হরমোন ( Synthetic Hormone or Artificial Hormone )

সংজ্ঞা ( Definition ): যেসব হরমোন ল্যাবরেটরিতে সংশ্লেষ করা হয় অথচ প্রাকৃতিক হরমোনের মতোই কার্যকরী , তাদের সংশ্লেষিত বা সিন্থেটিক হরমোন বা কৃত্রিম হরমোন বলে । উদাহরণ — কৃত্রিম অক্সিন , কৃত্রিম জিব্বেরেলিন ইত্যাদি । কৃত্রিম হরমোনের অপর নাম প্ল্যান্ট গ্রোথ রেগুলেটরস ( PGRS ) ।

কৃত্রিম হরমোনের ভূমিকা ( Role of synthetic hormone ): কৃত্রিম হরমোন বা সিন্থেটিক হরমোনের কয়েকটি ব্যবহারিক প্রয়োগ এখানে উল্লেখ করা হল—

  1. শাখা কলম থেকে নতুন উদ্ভিদ সৃষ্টি : গোলাপ , আম , পেয়ারা , লেবু প্রভৃতি উদ্ভিদের শাখা কলমে কৃত্রিম অক্সিন ( IBA , NAA ) প্রয়োগ করে তাড়াতাড়ি মূল উৎপন্ন করানো যায় । শাখা কলমে মূল জন্মানোর পর শাখাটিকে টবের মাটিতে রোপণ করলে নতুন উদ্ভিদ সৃষ্টি হয় । এরকম গাছের ফল মাতৃ উদ্ভিদের মতো সমগুণ সম্পন্ন হয় ।
  2. অপরিণত ফলের মোচন রোধ : কৃত্রিম অক্সিন [ 2 , 4 - D ( 2-4 ডাই ক্লোরোফেনক্সি অ্যাসেটিক অ্যাসিড ) ] স্প্রে করে গাছের মুকুল , কচি ফল ইত্যাদির ঝরে পড়া রোধ করা যায় । আম গাছের মুকুল আসার পর কৃত্রিম অক্সিন স্প্রে করলে অপরিণত ফলের মোচন রোধ করা যায় ।
  3. আগাছানাশক হিসেবে কৃত্রিম অক্সিনের ভূমিকা : ধান, গম, যব প্রভৃতি শস্যক্ষেত্রে কৃত্রিম অক্সিন ( 2 , 4 - D ) ব্যবহার করে আগাছা নির্মূল করা হয় । এতে ফসলের উপর কোনো স্থায়ী প্রভাব পড়ে না ।
  4. বীজবিহীন ফল সৃষ্টি : কৃত্রিম অক্সিন [ NAA ( ন্যাপথক্সি অ্যাসেটিক অ্যাসিড ) , IBA ( ইন্ডোল বিউটারিক অ্যাসিড ) ] প্রয়োগ করে পরাগযোগ ও নিষেক ছাড়াই উদ্ভিদের বীজবিহীন ফল সৃষ্টি করা হয় । যেমন — পেঁপে , কলা , টম্যাটো , পেয়ারা ইত্যাদি । বীজবিহীন ফল সৃষ্টি হওয়াকে পার্থেনোকার্পি বলে ।

Thanks for your comment. We review and answer your comment.

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post