প্রাণীদের সাড়াপ্রদানের একটি প্রকার হিসেবে গমন ( Locomotion As A Type of Response in Animals )

প্রাণীদের সাড়াপ্রদানের একটি প্রকার হিসেবে গমন ( Locomotion As A Type of Response in Animals

গমন ( Locomotion )

সাধারণত কোনো প্রাণীর সংবেদনশীলতা অনুভূত হয় যখন নিম্নলিখিত ঘটনাগুলি ঘটতে দেখা যায় , যেমন—

  1. প্রাণী খাদ্যের জন্য শিকার করে ।
  2. শিকার এবং নিজের আত্মরক্ষার জন্য স্থান ত্যাগ করে বা পলায়ন করে
  3. প্রাণীরা বংশবিস্তারের উদ্দেশ্যে পরস্পরের কাছে আসে । মেরুদণ্ডী প্রাণীদের সাড়া প্রদান বলতে বোঝায় পেশি, অস্থি ও অস্থিসন্ধির মধ্যে সমন্বয় ঘটিয়ে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়া । এক স্থান থেকে অন্য স্থানে কোনো জীবের সামগ্রিক স্থান পরিবর্তনই হল জীবের গমন ।

সংজ্ঞা ( Definition ) : যে প্রক্রিয়ায় জীব উদ্দীপনার প্রভাবে বা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সঞ্চালনের দ্বারা সামগ্রিকভাবে স্থান পরিবর্তন করে তাকে গমন বলে ।

গমনের চালিকা শক্তি ( Motivations behind Locomotion )

প্রাণীদের গমনের প্রধান চালিকা শক্তি বা উদ্দেশ্যগুলি হল—

  1. খাদ্য অন্বেষণ : প্রাণীরা খাদ্য অন্বেষণের জন্য স্থানান্তরে গমন করে ।
  2. খাদক প্রাণী থেকে আত্মরক্ষা : কোনো খাদক প্রাণী কর্তৃক আক্রান্ত হলে শিকার প্রাণীটি নিজেকে রক্ষার জন্য উক্ত স্থান থেকে পলায়ন করে । অর্থাৎ প্রাণীদের আত্মরক্ষার জন্য গমন করতে হয় ।
  3. ছড়িয়ে পড়া : একটি প্রাণী অনেকগুলি শাবকের জন্ম দিলে শাবকগুলি বড়ো হয়ে খাদ্য ও আশ্রয়ের জন্য বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে ।
  4. আশ্রয় বা বাসস্থান খোঁজা : প্রাণীরা তাদের পছন্দমতো ও নতুন আশ্রয়ের সন্ধানে স্থানান্তরে গমন করে ।
  5. প্রজনন : প্রজনন অর্থাৎ বংশবিস্তারের উদ্দেশ্যে প্রাণীদের গমনের প্রয়োজন হয় । উপযুক্ত সঙ্গী বা সঙ্গিনী খোঁজা , পুরুষ ও স্ত্রী প্রাণীদের যৌন মিলনের জন্য পরস্পর কাছে আসার জন্য গমনের প্রয়োজন হয় ।
  6. নতুন এবং অনুকূল পরিবেশের সন্ধান : অনুকূল পরিবেশের সন্ধানে প্রাণীদের গমন হয় ।

বিভিন্ন ধরনের প্রাণীর গমন ( Different Types of Animal Locomotion )

বিভিন্ন প্রাণী বিভিন্ন পরিবেশে বসবাস করে । তাই তাদের গমন অঙ্গ এবং গমন পদ্ধতি ভিন্ন প্রকৃতির হয় । নীচে প্রাণীগুলির গমন অঙ্গ ও গমন কৌশল সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হল—

1. সিউডোপোডিয়ার সাহায্যে অ্যামিবয়েড গমন ( Amoeboid Locomotion by pseudo podia ) :

সিউডোপোডিয়ার সাহায্যে অ্যামিবয়েড গমন

সিউডোপোডিয়ার মাধ্যমে চলন প্রধানত এককোশী আদ্যপ্রাণী অ্যামিবা ( Amoeba ) - তে দেখা যায় । অ্যামিবা যেদিকে গমন করতে ইচ্ছা করে সেই দিকের দেহমধ্যস্থ এক্টোপ্লাজম প্রলম্বিত হয়ে দেহের পরিধির দিকে একটি অস্থায়ী পদ বা ক্ষণপদ বা সিউডোপোডিয়া ( pseudopodia ) তৈরি করে । ক্ষণপদটি বর্ধিত হওয়ার পর এর আঠালো অগ্রভাগটি কোনো শক্ত বস্তুর সঙ্গে আর্টকে নেয় । এরপর দেহস্থ এন্ডোপ্লাজমকে ক্ষণপদের মধ্যে প্রবাহিত করে পশ্চাৎ অংশকে গুটিয়ে নেয় , ফলে অ্যামিবা গতিপথের দিকে কিছুটা এগিয়ে যায় । একই পদ্ধতিতে বারবার ক্ষণপদ প্রলম্বিত করে অ্যামিবা ধীরগতিতে স্থান পরিবর্তন করে । অ্যামিবার এই গমনকে অ্যামিবয়েড গমন ( Amoeboid locomotion ) বলে । মানুষের শ্বেতকণিকায় , স্পঞ্জের অ্যামিবোসাইট কোশে এইরকম চলন দেখা যায় ।

2. সিলিয়ার সাহায্যে প্যারামেসিয়ামের গমন ( Ciliary Locomotion in Paramoecium ) :

সিলিয়ার সাহায্যে প্যারামেসিয়ামের গমন

প্যারামেসিয়াম ( Paramoecium ) - এর বহিঃআবরণে অবস্থিত সিলিয়ার আন্দোলনের সাহায্যে গমন করে বলে এদের গমনকে সিলিয়ারি গমন ( cillary locomotion ) বলে । প্যারামেসিয়ামের সারা দেহে সিলিয়া অনুদৈর্ঘ্য সারিতে সজ্জিত থাকে । দেহাকৃতি সাঁতার কাটার উপযোগী বলে অগ্র ও পশ্চাৎ উভয় দিকে যেতে পারে । দেহের সিলিয়াগুলি নৌকার দাঁড়ের মতো একযোগে অগ্রভাগ থেকে পশ্চাৎ ভাগে জল ঠেলে দেহটিকে সামনের দিকে এগিয়ে নেয় । পরমুহূর্তে আবার সিলিয়াগুলিকে টেনে সামনের দিকে নিয়ে যায় এবং পুনরায় একইভাবে দাঁড়ের মতো ব্যবহার করে । প্রয়োজনে সিলিয়াগুলিকে বিপরীত মুখে সঞ্চালিত করে পিছোতে পারে অথবা একদিকের সঞ্চালন অপরদিকের তুলনায় কম বা বেশি করে গতিপথ পরিবর্তন করতে পারে ।

3. ফ্ল্যাজেলার সাহায্যে ইউগ্লিনার গমন ( Flagellar locomotion in Euglena ) :

ফ্ল্যাজেলার সাহায্যে ইউগ্লিনার গমন


ইউগ্লিনা ( Euglena ) নামক এককোশী প্রাণীদের ফ্ল্যাজেলা থাকে । ফ্ল্যাজেলার ছন্দোবদ্ধ আন্দোলনের সাহায্যে এই সকল প্রাণীরা জলে স্থানান্তরে গমন করে । ফ্লাজেলার সাহায্যে এই ধরনের গমনকে ফ্ল্যাজেলীয় গমন ( flageller locomotion ) বলে । ইউক্লিনা ফ্ল্যাজেলামকে নৌকার দাঁড়ের মতো চালনা করে সামনে এগিয়ে নিয়ে যায় । ফ্ল্যাজেলাম প্রতিবার চালনা করার সময় দেহের পেছনদিকে তির্যকভাবে আছড়ে পড়ে এবং প্রতিবার ফ্ল্যাজেলামের গোড়া থেকে প্রান্তভাগ পর্যন্ত স্পন্দনের ঢেউ পরিব্যাপ্ত হয় । ফলে যে সর্পিল চক্রাকার গতি সুচিত হয় তার জন্য সমগ্র দেহটি সামনের দিকে অগ্রসর হয় ।

4. মাছের সত্তরণ ( Swimming in fish )

মাছ অসটিকথিস শ্রেণিভুক্ত মুখ্য জলজ প্রাণী ( primary aquatic animal ) । মাছ জলে সন্তরণ পদ্ধতিতে গমন করে । জলে সাঁতার কাটার সুবিধার জন্য দেহ মাকু আকৃতির হওয়া হওয়া ছাড়াও মাছের প্রধান গমন অঙ্গ পাখনা ( fins ) এবং মেরুদণ্ড সংলগ্ন মায়োটোম পেশি ( myotome muscles ) থাকে ।

গমনে পাখনার ভূমিকা :

মাছের সাতটি পাখনা

মাছের সাতটি পাখনা থাকে । পাখনাগুলি রশ্মিবিশিষ্ট হওয়ায় জলের চাপে ছিঁড়ে যায় না , প্রতিটি পাখনার গোড়ায় মজবুত পেশি সংলগ্ন থাকে । পেশিগুলির সংকোচন - প্রসারণ ঘটিয়ে মাছ পাখনাগুলিকে সঞ্চালন করে । নীচে বিভিন্ন পাখনাগুলির অবস্থান ও গমনের ভূমিকা উল্লেখ করা হল—

পাখনার নাম সংখ্যা অবস্থান গমনে ভুমিকা
বক্ষ পাখনা একজোড়া বক্ষদেশে অবস্থিত গমনের সময় মাছকে জলে ওঠা - নামা করতে এবং স্থিরভাবে ভেসে থাকতে সাহায্য করে
শ্রোণি পাখনা একজোড়া শ্রোণিদেশে অবস্থিত বক্ষ পাখনার অনুরূপ কাজ
পৃষ্ঠ পাখনা একটি পৃষ্ঠদেশে অবস্থিত গমনের সময় মাছকে জল কেটে এগিয়ে যেতে এবং দেহের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে ।
পায়ু পাখনা একটি অঙ্কদেশে পায়ুর ঠিক পিছনে অবস্থিত গমনে বিশেষ ভূমিকা নেই ।
পুচ্ছ পাখনা একটি লেজের শেষভাগে অবস্থিত গমনের সময় দিক পরিবর্তনে সাহায্য করে ।

মাছের গমনে মায়োটোম পেশির ভূমিকা :

মাছের মায়োটোম পেশি
মাছের নমনীয় মেরুদণ্ডের দু - পাশে লেজের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত অক্ষ বরাবর অসংখ্য ‘ V ’ আকৃতির মায়োটোম পেশি বিস্তৃত থাকে । এই মায়োটোম পেশিগুলির তরঙ্গায়িত সংকোচন ( metachromal contraction ) মাছের দেহের অগ্রপ্রান্ত থেকে পশ্চাদপ্রান্ত পর্যন্ত প্রবাহিত হওয়ার ফলে মেরুদণ্ড দু - পাশে পর্যায়ক্রমে আন্দোলিত হয় এবং মাছ সামনের দিকে এগিয়ে যায় । পেশি যেদিকে সংকুচিত হয় মেরুদণ্ড সেদিকে বেঁকে যায় । ওই সময় বিপরীত দিকের পেশি প্রসারিত থাকে । মায়োটোম পেশিগুলির পর্যায়ক্রমে সংকোচন ও প্রসারণের জন্য মেরুদণ্ডটিও পর্যায়ক্রমে দু - পাশে আন্দোলিত হতে থাকে , ফলে মাছ সামনের দিকে অগ্রসর হতে থাকে ।

মাছের গমন কৌশল ( Mechanism of locomotion of fish ) :

সন্তরণ ( Swimming ) :
মাছের সন্তরণ

মাছ মুখ্যত পাখনা ও মায়োটোম পেশির সঞ্চালন ঘটিয়ে সাঁতার কাটে । মেরুদণ্ডের অস্থিসংলগ্ন মায়োটোম পেশির সংকোচন ও প্রসারণ ঘটিয়ে মেরুদণ্ডকে তথা সমগ্র দেহকে দু - পাশে আন্দোলিত করে । এই আন্দোলন সম্মুখভাগ থেকে পশ্চাদ্‌দিকে প্রবাহিত হওয়ায় মাছ ক্রমশ সামনের দিকে এগিয়ে যেতে থকে । বক্ষ পাখনা ও শ্রোণি পাখনার মিলিত প্রয়াসে মাছ জলের নীচে ও ওপরে উঠা - নামা করতে পারে । আবার জলের যে কোনো তলে স্থিরভাবে ভেসে থাকতে পারে । পুচ্ছ পাখনার সাহায্যে মাছ গমনের সময় দিক পরিবর্তন করে । লেজ ও পুচ্ছ পাখনাকে ডান দিকে বাঁকিয়ে মাছ বাঁ দিকে ঘোরে আবার বাঁ দিকে বাঁকিয়ে ডান দিকে ঘোরে । অর্থাৎ লেজ সত্তরণকালে নৌকার হালের মতো কাজ করে । মাছের পটকা মাছকে জলে ডুবতে ও ভাসতে সাহায্য করে ।


5. পাখির উড্ডয়ন ( Flight in a bird ) :

অ্যাভিস ( Aves ) বা পক্ষী শ্রেণিভুক্ত মেরুদণ্ডী প্রাণীদের প্রকৃত উড্ডয়ন ( true flight ) দেখা যায় বলে এদের মুখ্য খেচর প্রাণী বলা হয় ।

গমনে ডানা , পালক ও উড্ডয়ন পেশির ভূমিকা :

ডানা ( Wing ) :

পাখিদের অগ্রপদ ডানায় রূপান্তরিত । ডানাগুলি পর্যায়ক্রমে উপর - নীচে আন্দোলন করে পাখিকে উড়তে সাহায্য করে । প্রতিটি ডানা সামনের দিকে প্রশস্ত এবং পেছনের দিকে ক্রমশ সংকীর্ণ । এর ফলে উপরের দিক থেকে নীচে বাতাসের চাপ ডানায় বেশি পড়ে বলে ডানাটি সহজে বাতাসে ভেসে থাকতে পারে ।

পায়রার উড্ডয়ন পেশী
@dinvar.com


পালক ( Feather ) :

পাখির সারাদেহ পালক দ্বারা আবৃত । দুটি ডানার প্রান্তভাগে 23 টি করে বড়ো পালক , যেগুলি ডানার তল বৃদ্ধি করে উড্ডয়নে সাহায্য করে , এদের রেমিজেস ( remiges ) বলে এবং পুচ্ছভাগে 12 টি বড়ো পালক উড্ডয়নের সময় দিক পরিবর্তনে সাহায্য করে , এদের রেকট্রিসেস ( rectrices ) বলে ।


উড্ডয়ন পেশি ( Flight muscle ) :
পায়রার স্টারনাম সংলগ্ন উড্ডয়ন পেশী

পাখির বক্ষে স্টারনাম সংলগ্ন অঞ্চলে উড্ডয়ন পেশি থাকে । পেশিগুলি যথাক্রমে পেক্টোরালিস মেজর , পেক্টোরালিস মাইনর এবং কোরাকো ব্রাকিয়ালিস ( coraco brachialis ) । পেক্টোরালিস মেজর সংকুচিত হয়ে পালক আবৃত ডানাকে উপর থেকে নীচের দিকে টেনে আনে । ডানার এই নিম্ন ঘাতের ফলে পাখি সামনের দিকে অগ্রসর হয় । পরবর্তী পর্যায়ে পেক্টোরালিস মাইনর সংকুচিত হলে ঊর্ধ্বঘাতের ফলে ডানা উপরের দিকে উঠে যায় । এইভাবে পেশিগুলির সংকোচন ও প্রসারণের ফলে পাখির ডানা দুটিকে অবিরাম প্রসারণ , অবনমন এবং উত্তোলনে সহায়তা করে পর্যায়ক্রমে দাঁড়ের মতো কাজ করে পাখিকে সামনের দিকে এগোতে সাহায্য করে ।


6. মানুষের গমন ( Locomotion in Human ) :

মানুষের দুটি পা - এর সাহায্যে গমনকে দ্বিপদ গমন (pripedal locomotion )বলে ।

মানুষের ( Homo sapiens ) দ্বিপদ গমন পদ্ধতিতে প্রধানত দুটি পা এর সঙ্গে হাত , অস্থি , অস্থিসন্ধি , অস্থিসংলগ্ন পেশিও সমানভাবে অংশগ্রহণ করে । অস্থিসংলগ্ন ঐচ্ছিক পেশির পর্যায়ক্রমিক সংকোচন বা ফ্লেক্সন ও প্রসারণ বা এক্সটেনসন - এর ফলে অস্থির নিকটবর্তী ও দূরবর্তী সঞ্চালন ঘটে ।

স্থিরভাবে দাঁড়ানোর সময় মানুষের পা দুটি দেহের ভার বহন করে , কিন্তু হাঁটা বা চলার সময় এই ভার ভূমিসংলগ্ন পদ অর্থাৎ পায়ের পাতার ( foot ) উপর ন্যস্ত হয় । হাঁটার সময় দেহের ঊর্ধ্বাংশের , অর্থাৎ দেহকাণ্ডের অগ্রগতি হয় এবং নিম্নাংশ অর্থাৎ পা দুটি ভূমির উপর অবস্থান করে । দেহের ঊর্ধ্বাংশের অগ্রগতিতে দেহের ভারকেন্দ্রের ( centre of gravity ) পরিবর্তন ঘটে , ফলে দেহকাণ্ড সামনের দিকে পতনের সম্মুখীন হয় । এই পতন রোধ করার জন্য বাঁ পা সামনের দিকে প্রসারিত হয় । বাঁ পায়ের অগ্রগতির সময় প্রথমে গ্যাস্ট্রোকনেমিয়াস ( gastrocnemious ) নামক কাফ্ পেশির সংকোচনে গোড়ালির অস্থিতে চাপ পড়ে , ফলে গোড়ালি মাটি থেকে ওপরে উঠে আসে । পরক্ষণে এক্সটেনসর ডিজিটেরিয়াম পেশির সংকোচনে পায়ের সম্মুখভাগও উত্তোলিত হয় । এরপর বাইসেপস ফিমোরিস পেশির সংকোচনে পা ওপরের দিকে উত্তোলিত হয়ে সামনের দিকে অগ্রসর হয় । পা মাটি থেকে সম্পূর্ণভাবে উত্তোলিত হয়ে সামনের দিকে অগ্রসর হলে সমগ্র পেশিগুলি প্রসারিত হয় । পেশি প্রসারণ ও মাধ্যাকর্ষণজনিত আকর্ষণের ফলে পা মাটিতে পুনরায় নেমে আসে । পদ্ধতিটি পর্যায়ক্রমে একবার বাঁ পা আবার ডান পায়ে চলতে থাকে , ফলে মানুষ হেঁটে সামনের দিকে অগ্রসর হয় । দৌড়ানোর সময় পদ্ধতিটি দ্রুতগতিতে সম্পন্ন হয় । এইরকম গমনের সময় মানুষের হাত দুটিও পর্যায়ক্রমে সামনে ও পিছনে সঞ্চালিত হতে থাকে । সাধারণত বাঁ পা - এর অগ্রসরের সময় ডান হাত এবং ডান পা - এর অগ্রসরের সময় বাঁ হাত প্রসারিত হয় । ফলে দেহের ভারসাম্য বজায় থাকে ।

মানুষের দ্বিপদ গমন

এ ছাড়া গমনের সময় লঘুমস্তিস্ক ও অন্তঃকর্ণে অবস্থিত অর্ধচন্দ্রাকার নালিঅটোলিথ যন্ত্র দেহের ভারসাম্য রক্ষায় সহায়তা করে । পদ্ধতিটি নিম্নলিখিতভাবে সম্পন্ন হয়—
( i ) অস্তঃকর্ণের ভেস্টিবিউলে এবং অর্ধচন্দ্রাকার নালির অ্যাম্পুলাতে সংবেদনশীল কোশ থাকে । এখানকার এন্ডোলিম্ফে অটোলিথ কণিকা ভাসমান অবস্থায় থাকে ।
( ii ) যখন দেহভঙ্গিমা পরিবর্তিত হয় তখন অটোলিথের মাধ্যমে সংবেদনশীল কোশগুলি উদ্দীপিত হয় ।
( iii ) উদ্দীপনা অডিটরি স্নায়ুর মাধ্যমে লঘুমস্তিষ্কে পৌঁছায় । লঘুমস্তিষ্ক থেকে উদ্দীপনা গুরুমস্তিষ্কে পৌঁছালে দেহের ভারসাম্য বজায় থাকে ।
( iv ) এ ছাড়া লঘুমস্তিষ্ক , গুরুমস্তিষ্ক থেকে বার্তা সংগ্রহ করে হাত ও পা এর চলনের সমন্বয় সংঘটিত করে ।


মানুষের গমনে সচল সন্ধি ও কঙ্কাল পেশির ভূমিকা ( Role of Movable Joints . and Skeletal Muscles in Human )

মানুষের চলন ও গমনে সচল অস্থিসন্ধি এবং কঙ্কালসংলগ্ন পেশি সহায়তা করে । অস্থিগুলি ঐচ্ছিক পেশির সঙ্গে যুক্ত । তাছাড়া দুটি অস্থির মেরুশীর্ষ যেমন তরুণাস্থি দ্বারা গঠিত , তেমনি দুটি অস্থির সন্ধিস্থান অস্থিবন্ধনী দ্বারা আবৃত , যার মধ্যে ঘর্ষণ নিবারণের জন্য পিচ্ছিল সাইনোভিয়াল তরল অবস্থান করে ।

1 . সচল সন্ধি ( Movable joint ) :

দুটি অস্থির সংযোগস্থলকে অস্থিসন্ধি বলে । যেসব অস্থিসন্ধি নড়াচড়া করতে পারে তাদের সচল অস্থিসন্ধি বলে । যেমন — বল ও সকেট সন্ধি , কব্‌জা সন্ধি ইত্যাদি ৷


সাইনোভিয়াল অস্থিসন্ধি ( Synovial joints ) :

অস্থিসন্ধি যে পর্দা দ্বারা বেষ্টিত থাকে তাকে সাইনোভিয়াল পর্দা এবং সাইনোভিয়াল পর্দার মধ্যে একটি ক্ষুদ্র গহ্বর থাকে , তাকে সাইনোভিয়াল গহ্বর বলে । সাইনোভিয়াল পর্দা থেকে ক্ষরিত সাইনোভিয়াল তরল ( synovial fluid ) সাইনোভিয়াল গহ্বরে সঞ্চিত হয় । এই তরল সংযুক্ত অস্থি দুটিকে ঘর্ষণজনিত আঘাত থেকে রক্ষা করে । অস্থিসন্ধিগুলি লিগামেন্ট ( ligament ) নামক একপ্রকার বন্ধনী দ্বারা আবদ্ধ থাকে । সেই সঙ্গে টেন্ডন বা কন্ডরা ( tendon ) অস্থি দুটিকে পেশির সঙ্গে যুক্ত রাখে । কেবলমাত্র সচল সন্ধিগুলি গমনে সাহায্য করে।

সাইনোভিয়াল অস্থিসন্ধি


সচল অস্থিসন্ধির প্রকারভেদ ( Types of movable bone joints )

সস্থির নাম সন্ধির প্রকৃতি কাজ উদাহরণ
1. কব্জা সন্ধি ( Hinge joint ) একটি অস্তির গোল প্রান্ত যখন অপর অস্তির অর্ধগোলাকার অবতল অঙ্গে যুক্ত থাকে। এই ধরনের অস্থিসন্ধিগুলি কেবল একটি নির্দিষ্ট দিকে সঞ্চালিত হয় । বিপরীত দিকে স্যালিত হয় না । হাঁটু ও কনুই এর অস্থিসন্ধি 
2. বল ও সকেট অস্থিসন্ধি ( Ball and socket joint ) একটি অস্থির গোলাকার প্রাস্ত ( বল ) যখন অপর অস্থির সকেটের সঙ্গে যুক্ত থাকে । এই ধরনের অস্থিসন্ধি প্রায় সকল দিকে সঞ্চালিত হয় । স্কন্ধসন্ধি ( স্ক্যাপুলার সঙ্গে হিউমেরাসের সংযোগ ) , উরুসন্ধি ( ফিমার ও শ্রেণিচক্রের সন্ধি ) 

হাঁটু ও কনুই এর অস্থিসন্ধি


2. কঙ্কালসংলগ্ন পেশি ( Skeletal muscle ) :

কঙ্কাল বা অস্থির সঙ্গে যেসব পেশি সংলগ্ন থাকে তাদের কঙ্কালসংলগ্ন পেশি বলে । এইসব পেশিগুলি মানুষের অস্থিসঞ্চালনে ও গমনে সাহায্য করে । নিচে অস্থি সঞ্চালনে পেশির ভূমিকাগুলি উল্লেখ করা হল

( a ) ফ্লেক্সন ( Flexion ) :

যে প্রক্রিয়ায় দুটি অস্থি ভাজ হতে বা কাছাকাছি আসতে সহায়তা করে , তাকে ফ্লেক্সন বলে । আর যেসকল পেশি ফ্লেক্সন ক্রিয়ায় অংশ নেয় , তাদের ফ্রেক্সর পেশি বলে । যেমন — বাইসেপস পেশি কনুই সন্ধিকে ভাজ হতে সাহায্য করে ।

( b ) এক্সটেনসন ( Extension ) :

যে প্রক্রিয়ায় সন্ধিস্থল প্রসারিত হয় অর্থাৎ ভাজ করা অঙ্গকে দূরে সরে যেতে সহায়তা করে , তাকে এক্সটেনসন এবং অংশ নেওয়া পেশিকে এক্সটেনসর পেশি বলে । যেমন — ট্রাইসেপস পেশি সংকুচিত হলে ভাজ করা হাত সোজা হয় , অর্থাৎ পুরোবাহু বাহুর কাছ থেকে দূরে সরে যায় ।

ফ্লেক্সন এক্সটেনসন


( c ) অ্যাবডাকশন ( Abduction ) :

যে প্রক্রিয়ায় কোনো অঙ্গ দেহাক্ষ থেকে দূরে সরে যায় তাকে অ্যাবডাকশন এবং অংশ নেওয়া পেশিকে অ্যাবডাকটর পেশি বলে । যেমন — ডেলটয়েড পেশি হাতকে দেহঅক্ষ থেকে দূরে সরে যেতে সাহায্য করে ।

( d ) অ্যান্ডাকশন ( Adduction ) :

যে প্রক্রিয়া কোনো অঙ্গকে দেহাক্ষের নিকটবর্তী হতে সহায়তা করে তাকে অ্যাডাকশন এবং অংশগ্রহণকারী পেশিকে অ্যাডাকটর পেশি বলে । যেমন - ল্যাটিসিমাস ডরসি হাতকে দেহঅক্ষের নিকটবর্তী হতে সাহায্য করে ।

( e ) রোটেশন ( Rotation ) :

যে প্রক্রিয়ায় দেহের কোনো অংশ আবর্তিত হয় তাকে রোটেশন এবং অংশগ্রহণকারী পেশিকে রোটেটর পেশি বলে । যেমন — পাইরিফরমিস পেশি ফিমারকে আবর্তিত করতে সহায়তা করে ।

অ্যাবডাকশন অ্যান্ডাকশন রোটেশন


Thanks for your comment. We review and answer your comment.

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post