কয়েকটি সাধারণ জিনগত রোগ ( Some Common Genetic Diseases )

কয়েকটি সাধারণ জিনগত রোগ ( Some Common Genetic Diseases )

পপুলেশনে সাধারণ জিনগত রোগ ( Common Genetic Diseases in Population )

পপুলেশনে কয়েকটি সাধারণ জিনগত রোগ বা বংশগত রোগ হল থ্যালাসেমিয়া , হিমোফিলিয়াবর্ণান্ধতা । নীচে রোগগুলি সম্পর্কে আলোচনা করা হল—

1. থ্যালাসেমিয়া ( Thalassemia ) :

থ্যালাসেমিয়া একটি বংশগত রোগ । জিনগত এ্রুটির ফলে রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ কমে যায় , ফলে মারাত্মক রক্তাল্পতা ( anaemia ) দেখা দেয় । রোগীকে যথাসময়ে এবং পরিমাণ মতো রক্ত না দিতে পারলে রোগীর মৃত্যু হয় । হিমোগ্লোবিনের অভাবের জন্য রক্তের অক্সিজেন বহন ক্ষমতা কমে যায় । রোগীকে বারবার রক্ত বদলাতে হয় । বারবার রক্ত বদলানোর ফলে দেহে লোহার পরিমাণ বেড়ে যায় । দেহে লোহা জমে যাওয়ায় হৃৎপিণ্ড , যকৃৎ ও অন্তঃক্ষরা গ্রন্থির ক্ষতি হয় ।

থ্যালাসেমিয়া একপ্রকারের প্রচ্ছন্ন অটোজোমাল জিন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত লোহিত রক্তকণিকার বিশৃঙ্খলা , যেখানে এক বা একাধিক হিমোগ্লোবিন পলিপেপটাইড শৃঙ্খলের অনুপস্থিতি , হ্রাসপ্রাপ্ত সংশ্লেষ অথবা গঠনগত বিচ্যুতি যার ফলে তীব্র বা মৃদু রক্তাল্পতা , পান্ডুরোগ এবং হ্রস্ব জীবনকাল ইত্যাদি পরিলক্ষিত হয় ।

লক্ষণ ( Symptoms ):

  1. এই রোগের প্রধান লক্ষণ হল হিমোগ্লোবিন উৎপাদনের এ্রুটি এবং রক্তাল্পতা , বিশেষ করে হিমোলাইটিক অ্যানিমিয়া রোগ হয় ।
  2. এছাড়া হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ কমে যাওয়ায় লোহিতকণিকার আকারও ছোটো হয়ে যায় ।
  3. অস্থি দুর্বল ও বিকৃত হয় ।
  4. যকৃৎ ও প্লিহার বৃদ্ধি ।
  5. কালচে মূত্র

থ্যালাসেমিয়ার কারণ ( Causes of Thalassemia ) :

থ্যালাসেমিয়া দু - প্রকারের , যথা— A থ্যালাসেমিয়া এবং B থ্যালাসেমিয়া ।


A-থ্যালাসেমিয়ার কারণ :

জিনগত এ্রুটির জন্য যখন A পলিপেপটাইড তৈরি হয় না বা কম পরিমাণে তৈরি হয় তখন এই প্রকার থ্যালাসেমিয়া দেখা দেয় । হিমোগ্লোবিনের পলিপেপটাইড তৈরির জন্য ক্রোমোজোম 16 - তে ( অটোজোম ) দুটি A - গ্লোবিন জিন থাকে । মানুষের দুটি ক্রোমোজোমে যখন দুটি করে A পলিপেপটাইড তৈরির জিন থাকে তখন তাকে বলা হয় স্বাভাবিক অবস্থা । 16 নং ক্রোমোজোমের 2 টি কিংবা 1 টি A - জিন ক্ষয় হলে থ্যালাসেমিয়া দেখা দেয় । যখন দুটি হোমোলোগাস ক্রোমোজোমের 1 টিতে 2 টি A - গ্লোবিন জিন নষ্ট হয় , তখন তাকে বলা হয় হেটারোজাইগাস অবস্থা । এই অবস্থায় A - হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ অর্ধেক হয়ে যায় । এক্ষেত্রে মৃদু রক্তাল্পতা লক্ষণ প্রকাশিত হয় । একে থ্যালাসেমিয়া মাইনর বলে । কিন্তু দুটি হোমোলোগাস ক্রোমোজোমের উভয় A - জিন ক্ষয় হলে যে হোমোজাইগাস অবস্থার সৃষ্টি হয় তার কারণে A পলিপেপটাইড তৈরি হয় না । এর ফল হিসেবে মারাত্মক রক্তাল্পতা সৃষ্টি হয় । একে থ্যালাসেমিয়া মেজর বলে । 

থ্যালাসেমিয়ার কারণ

B- থ্যালাসেমিয়ার কারণ :

B- গ্লোবিন পলিপেপটাইড উৎপাদনের কোনোরকম এ্রুটির জন্য এই প্রকার থ্যালাসেমিয়া সৃষ্টি হয় । B- গ্লোবিন পলিপেপটাইড সংশ্লেষণ ও উৎপাদন কম হলে রোগীর কম রক্তাল্পতা দেখা যায় । কিন্তু B- গ্লোবিন পলিপেপটাইড উৎপাদন সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে গেলে রক্তে হিমোগ্লোবিন আর থাকে না বললেই চলে । তখন রোগী মারাত্মক রক্তাল্পতায় ভোগে ।

রোগের তীব্রতা অনুসারে থ্যালাসেমিয়া দু প্রকারের হয় , যেমন—
( i ) থ্যালাসেমিয়া মেজর : এটি তীব্র প্রকৃতির । এই রোগের লক্ষণ 6 মাস থেকে 2 বছরের মধ্যে প্রকাশ পায় ।



( ii ) থ্যালাসেমিয়া মাইনর : এই রোগ তীব্র আকার ধারণ করে না ।

থ্যালাসেমিয়ার বংশগতি ( Heredity of Thalassemia ) :

থ্যালাসেমিয়া রোগটি বংশানুক্রমিক । বাবা - মা দু - জনেই স্বাভাবিক হেটারোজাইগাস ) হলেও সন্তানদের থ্যালাসেমিয়া হওয়ার সম্ভাবনা থাকে । যেমন --
বাবা = a-thal+ / a-thal
মা = a-thal+ / a-thal


2. হিমোফিলিয়া ( Haemophilia ) :

হিমোফিলিয়া একপ্রকারের রক্তক্ষরণজনিত বংশগত রোগ । এই রোগে আক্রান্ত মানুষের রক্ত জমাট বাঁধতে অনেক সময় নেয় ফলে প্রচুর রক্তপাত হয় এবং লোকটি মারাও যেতে পারে। ' Y ' ফ্রোমোজোমে অবস্থিত একটি জিনের মিউটেশনের ফলে এই রোগ প্রকাশ পায় । হিমোফিলিয়া রোগটির প্রকাশ পুরুষদের মধ্যে বেশি হয় । সাধারণত স্ত্রীলোকেরা এই রোগটির বাহক হয় । কোন হোমোজাইগাস অবস্থায় মহিলাদের মধ্যে এই রোগটির প্রকাশ ঘটে । তাই পপুলেশনে 10 কোটি স্ত্রীলোকে মাত্র 1 জন এই রোগাক্রান্ত হয় ।

মানুষের যে বংশগত রোগের ফলস্বরূপ আঘাতপ্রাপ্ত স্থান ( ক্ষত , কাটা )থেকে রক্তক্ষরণ বন্ধ হয় না অর্থাৎ রক্ত তঞ্ছিত হয় না তাকে হিমোফিলিয়া বলে ।

হিমোফিলিয়ার প্রকার ( Types of Haemophilia ) :

হিমোফিলিয়া প্রধানত দু - প্রকারের , যথা-
( i ) হিমোফিলিয়া A : এই হিমোফিলিয়াকে রাজকীয় হিমোফিলিয়া বলা হয় । কারণ এই প্রকার হিমোফিলিয়া মহারানি ভিক্টোরিয়ার বংশধরদের মধ্যে দেখা গেছে । রক্ততঞ্চনের VIII নম্বর ক্যাক্টর বা অ্যান্টিহিমোফিলিক ফ্যাক্টর উৎপন্ন না হলে এই রোগ হয় ।
( II ) হিমোফিলিয়া B : এই প্রকার হিমোফিলিয়াকে ক্রিসমাস ডিজিজ বলে । এক্ষেত্রে রস্তুতনের IX নম্বর ফ্যাক্টর বা ক্রিসমাস ফ্যাক্টর থাকে না ।

কারণ ( Causes ) :

হিমোফিলিয়া রোগ X ক্রোমোজোেম বাহিত প্রচ্ছন্ন জিন দ্বারা উৎপন্ন হয় । হিমোফিলিয়া A রোগের জিন X ক্রোমোজোমের দীর্ঘ বাহুর প্রান্তভাগে অবস্থিত । প্রচ্ছন্ন জিন থাকার ফলে রক্ততঞ্চনের VIII নম্বর ফ্যাক্টর কার্যকরী হয় না । হিমোফিলিয়া B রোগের জিনও X ক্রোমোজোমে অবস্থিত ।

লক্ষণ ( Symptoms ) :

হিমোফিলিয়া একটি বংশগত রোগ । এই রোগে আঘাতপ্রাপ্ত স্থান থেকে অবিরাম রক্তক্ষরণ হতে থাকে । রক্ততঞ্চন হয় না ।

হিমোফিলিয়া

উত্তরাধিকার ( Inheritance ) :

হিমোফিলিয়া আক্রান্ত পুরুষ বা মহিলা 20 বছরের মধ্যে রক্তক্ষরণের ফলে মারা যায় । এই কারণে স্বাভাবিক পুরুষ ও হিমোফিলিয়া আক্রান্ত মহিলা এবং হিমোফিলিয়া আক্রান্ত পুরুষ ও স্বাভাবিক মহিলার মধ্যে বিবাহ হওয়া সম্ভব নয় । কেবল স্বাভাবিক ( বাহক ) মহিলা ও স্বাভাবিক পুরুষের মধ্যে বিবাহ হতে পারে । এক্ষেত্রেও 50 % পুত্রসস্তান হিমোফিলিয়া আক্রান্ত হতে পারে।


3. বর্ণান্ধতা ( Colour blindness ) :

মানুষের চোখের রেটিনায় অবস্থিত কোন কোশ বর্ণ দেখতে সাহায্য করে । যারা বিভিন্ন বর্ণের পার্থক্য করতে পারে না তাদের বর্ণান্ধ ( colour blind ) বলে । লাল বর্ণান্ধতাকে প্রোটানোপিয়া ( protanopia ) , সবুজ বর্ণান্ধতাকে ডিউটেরানোপিয়া ( deuteranopia ) এবং নীল বর্ণান্ধতাকে ট্রাইটানোপিয়া ( tritanopia ) বলে ।

যে বৈশিষ্ট্যের বহিঃপ্রকাশে কোনো মানুষ লাল - সবুজ বর্ণের পার্থক্য বুঝতে পারে না বা বর্ণ চিনতে ভুল করে , সেই প্রকার অস্বাভাবিকতাকে বর্ণান্ধতা বলে ।

কারণ ( Cause ) : বর্ণান্ধতা ' X ' ক্রোমোজোমে অবস্থিত একটি জিনের মিউটেশনের জন্য হয় ।

লক্ষণ ( Symptoms ) : লাল - সবুজ বর্ণ চিনতে না পারা বা লাল - সবুজ বর্ণ দেখতে না পাওয়া ।

বর্ণান্ধতা

অটোজোমাল ক্রোমোজোমঘটিত রোগ হিসেবে থ্যালাসেমিয়া এবং জেনেটিক কাউন্সেলিং ( Thalassemia As An Autosomal Chromosomal Disorder and Genetic Counselling )

থ্যালাসেমিয়া একপ্রকারের অটোজোমবাহিত প্রচ্ছন্ন জিনঘটিত রোগ , যে রোগে অস্বাভাবিক বা এ্রুটিপূর্ণ হিমোগ্লোবিন উৎপন্ন হয় । অস্বাভাবিক হিমোগ্লোবিন সঠিক মাত্রায় অক্সিজেন বহন করতে পারে না এবং লোহিত রক্তকণিকা বিদীর্ণ হয়ে যায় ।

A থ্যালাসেমিয়ার জিন 16 নং ক্রোমোজোমে এবং B থ্যালাসেমিয়ার জিন 11 নং ক্রোমোজোমে অবস্থান করে । থ্যালাসেমিয়া রোগটি কিছু হারিয়ে যাওয়া জিন থেকে প্রকাশ পায় । থ্যালাসেমিয়া রোগাক্রান্ত ব্যক্তির হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ কমে যায় । RBC- র পরিমাণ হ্রাস পায় এবং O2 পরিবহণ হ্রাস পায় । এর ফলে রোগীর মাইক্রোসাইটিক অ্যানিমিয়া ( microcytic anaemia ) হতে দেখা যায় । হিমোগ্লোবিন ও লোহিতকণিকার ধ্বংসের জন্য রক্তে লোহা সঞ্ছিত হতে থাকে । এছাড়া রোগীকে বারবার রক্ত দেওয়ার কারণেও লোহা সঞ্চিত হতে থাকে । এর ফলস্বরূপ হৃৎপিণ্ড , যকৃৎ , অস্তঃক্ষরা তন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয় ।


থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে জেনেটিক কাউন্সেলিং - এর ভূমিকা :

দুটি পরিবারের বিবাহের পর তারা যাতে সুস্থ থ্যালাসেমিয়া মুক্ত শিশুর জন্ম দিতে পারে তার জন্য যে পরামর্শ প্রদান করা হয় তাকে জিনগত পরামর্শ বা জেনেটিক কাউন্সেলিং বলে । পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে , থ্যালাসেমিয়া অটোজোম বাহিত প্রচ্ছন্ন জিনগত রোগ । এক্ষেত্রে পিতা বা মাতা হেটারোজাইগাস প্রকৃতির হলে তার থ্যালাসেমিয়া হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না । সে সামান্য রক্তাল্পতায় ভুগতে পারে । কিন্তু পিতা ও মাতা উভয়েই হেটারোজাইগাস অবস্থায় থাকলে পুত্র বা কন্যার থ্যালাসেমিয়া রোগ হতে পারে । 50 % শিশু বাহক প্রকৃতির হয় এবং 25 % সন্তান থ্যালাসেমিয়া রোগগ্রস্ত হয় । এই কারণেই বিবাহের পূর্বে দম্পতির পরিবারের কেউ মেজর থ্যালাসেমিয়া রোগগ্রস্ত না থাকে , সেইজন্য রক্ত পরীক্ষা করা দরকার এবং উভয় পরিবারকে জেনেটিক পরামর্শ দেওয়া দরকার ।

জানার বিষয়
  • জনগোষ্ঠী থেকে থ্যালাসেমিয়া দূর করার জন্য যেসব উদ্যোগ নেওয়ার প্রয়োজন তা হল—
    ( i ) থ্যালাসেমিয়া রোগের ভয়াবহতা জনগণকে জানানো ।
    ( ii ) বিবাহের পূর্বে পাত্র এবং পাত্রী উভয়ের থ্যালাসেমিয়ার রক্ত পরীক্ষা করা ।
    ( iii ) বিবাহ রেজিস্ট্রার অফিসে থ্যালাসেমিয়ার রক্ত পরীক্ষা করা বাধ্যতামূলক – তার পোস্টার টাঙানো ইত্যাদি ।
  • থ্যালাসেমিয়া রোগীকে যেমন রক্ত দান করার প্রয়োজন হয় , তেমন রোগীর দেহ থেকে চিলেশন পদ্ধতিতে ( chelation therapy ) লোহা অপসারণ বা অস্থিমজ্জার প্রতিস্থাপনের সাহায্যে রোগ নির্মূল করা সম্ভবপর হয়েছে ।

Thanks for your comment. We review and answer your comment.

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post