১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের মহাবিদ্রোহ

১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে বড়লাট ক্যানিং - এর শাসনকালে ( ১৮৫৬-১৮৬২ খ্রিঃ ) ভারতবর্ষের এক বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বিদ্রোহের আগুন জ্বলে ওঠে, এই বিদ্রোহকে অনেকে সিপাই বিদ্রোহ বা মহাবিদ্রোহ বলে থাকে। এই বিদ্রোেহ ভারতে ইংরেজ শাসনের ভিতকে কাপিয়ে দেয় । এই বিদ্রোহ প্রথম শুরু করেছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ভারতীয় সৈনিক বা সিপাহিরা । এই কারণে ইউরোপীয় ঐতিহাসিকেরা এই বিদ্রোহকে 'সিপাহি বিদ্রোহ' বলে অভিহিত করেছেন । কিন্তু , এই মত যুক্তিসম্মত নয়, কারন এই বিদ্রোহ ভারতবর্ষের পূর্ববর্তী বিদ্রোহগুলির মতো কোনও স্থানীয় বা বিশেষ কোনও গোষ্ঠীর বিদ্রোহ ছিল না । ভারতের যেমন এক বিস্তীর্ণ স্থানে এই বিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছিল , তেমনি বিদ্রোহের সূচনার অল্পদিনের মধ্যেই দেশের সর্বশ্রেণি ও সর্বস্তরের মানুষ এতে দলে দলে অংশগ্রহণ করেছিল । কোনও কোনও অঞ্চলে সিপাহিদের অপেক্ষায় না থেকে জনসাধারণ নিজেরাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিদ্রোহে অংশ নেয় , আবার কোথাও - বা জনতাই সেনাবাহিনীকে বিদ্রোহে যোগদিতে প্রণোদিত করে । তাই এই বিদ্রোহকে 'সিপাহি বিদ্ৰোহ' না বলে '১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের মহাবিদ্রোহ' বলাই যুক্তিসঙ্গত । আসলে এই বিদ্রোহ ছিল সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত বিক্ষোভের ফল ।

মহাবিদ্রোহের কারণ

রাজনৈতিক কারণ

১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশির যুদ্ধের পর থেকে একশো বছরের মধ্যে ভারতের এক বিস্তীর্ণ অংশে ইংরেজ আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয় । ইংরেজ সামরিক শক্তির কাছে পদানত হলেও ভারতীয় রাজন্যবর্গ কোনোদিনই ইংরেজ শাসনকে মেনে নিতে পারেন নি । লর্ড ডালহৌসি - র নগ্ন সাম্রাজ্যবাদী নীতি রাজন্যবর্গ ও প্রজাবর্গের মনে এক তীব্র ব্রিটিশ বিরোধী মনোভাব সৃষ্টি করে ৷ স্বত্ববিলোপ নীতি ও কুশাসনের অজুহাতে তিনি সাতারা , সম্বলপুর , নাগপুর , ঝাঁসি , তাঞ্জোর , কর্ণাটক , অযোধ্যা প্রভৃতি রাজ্যগুলি গ্রাস করেন । পেশোয়া দ্বিতীয় বাজিরাও - এর দত্তকপুত্র নানাসাহেবের বাৎসরিক ভাতা ও ' পেশোয়া ' পদ তিনি লুপ্ত করেন । তিনি দিল্লির বাদশাহকে তাঁর প্রাসাদ থেকে বহিষ্কৃত করেন এবং তাঁর উপাধি বিলুপ্ত করা হয় । রাজন্যবর্গের প্রতি এই হীন আচরণ হিন্দু - মুসলিম সাধারণ ভারতবাসী ভালো চোখে দেখে নি । ডালহৌসি নির্লজ্জভাবে অযোধ্যা ও নাগপুরের রাজপ্রাসাদ লুণ্ঠন করেন । রাজপরিবারের বিলুপ্তির সঙ্গে সঙ্গে নাগপুরের রাজপ্রাসাদ লুণ্ঠিত হয় । আসবাবপত্রাদি , মণি - মুক্তা , অলংকার - এমনকী হাতি , ঘোড়া পর্যন্ত লুণ্ঠিত হয় এবং এর কিছু কলকাতায় প্রকাশ্যভাবে বিক্রি করা হয় । এইসব কার্যকলাপ সাধারণ প্রজাবর্গের মনে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে তীব্র ঘৃণা ও ভারতীয় রাজন্যবগের মনে তার আতঙ্ক ও অসন্তোষের সৃষ্টি করে । নাগপুর রাজ্য দখল এবং এই ধরনের নির্লজ্জ লুণ্ঠন ও মালপত্র বিক্রির ঘটনা সন্নিহিত প্রদেশগুলিতে অধিকতর বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে । ইংরেজ কর্তৃক অধিকৃত বিভিন্ন দেশীয় রাজ্যের রাজপরিবারের আশ্রিত ব্যক্তিগণ , জমিদার , তালুকদার এবং সেনাদল কর্মচ্যুত ও জীবিকাহীন হয়ে পড়ে । এর ফলে তাদের মধ্যে তীব্র নৈরাশ্য ও প্রবল অসন্তোষ দেখা দেয় ।

মহাবিদ্রোহের অর্থনৈতিক কারণ

ইংরেজদের স্বৈরাচারী ও সুপরিকল্পিত অর্থনৈতিক শোষণের ফলে দীর্ঘদিন ধরে ভারতীয়দের মনে তীব্র অসত্তোষ পুঞ্জীভূত হয় । ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত — এই একশো বছরের মধ্যে কোম্পানি এদেশ থেকে প্রচুর সোনা - রুপা ইংল্যান্ডে নিয়ে যায় । তাদের একচেটিয়া বাণিজ্যিক অধিকার যেমন এ দেশীয় বণিকদের দুর্দশার কারণ হয় , তেমনি শুদ্ধ - রহিত ইংল্যান্ড - জাত পণ্যসামগ্রীর সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতায় দেশীয় কুটির শিল্প - জাত সামগ্রী টিকতে পারি পারে নি । এর ফলে ভারতীয় কুটির শিল্প — বিশেষত তাঁতশিল্প ধ্বংস হয় এবং বেকারত্ব বৃদ্ধি পায় । ভারত পরিণত হয় ম্যাঞ্চেস্টার ও ল্যাঙ্কাশায়ারের কাঁচামাল সরবরাহের উৎস এবং উৎপন্ন পণ্যের খোলা বাজারে । ইংরেজদের ভূমি সংস্কার ও ভূমিরাজস্ব নীতি দেশবাসীকে চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেয় । বেন্টিঙ্কের ভূমি সংস্কার নীতির ফলে বহু প্রাচীন জমিদার বংশ অবলুপ্ত হয় এবং ডালহৌসি - নিযুক্ত ' ইনাম কমিশন 'বোম্বাই প্রেসিডেন্সির প্রায় ২০,০০০ জমিদারি বাজেয়াপ্ত করায় দেশের অর্থনৈতিক সংকট তীব্রতর হয়ে ওঠে । দরিদ্র কৃষকদের উপর অসহনীয় করভার চাপানো হয় । গদিচ্যুত শাসকদের আশ্রিত ব্যক্তি , কর্মচ্যুত সেনাদল , রাজকর্মচারী ও অভিজাত পরিবারবর্গের জীবিকা নির্বাহের পথ বন্ধ হয়ে যায় । লর্ড কর্ণওয়ালিসের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত কৃষক , প্রাচীন জমিদার সম্প্রদায় ও সাধারণ গ্রামবাসীর জীবনে সর্বনাশ ডেকে আনে । মাদ্রাজের ' উত্তর সরকার ' অঞ্চলের ভূমিরাজস্ব ব্যবস্থার ফলে জমিদার শ্রেণি ক্ষতিগ্রস্ত হয় । মাদ্রাজে ' রায়তওয়ারি ব্যবস্থা ' - র ফলে ভূমিরাজস্বের পরিমাণ প্রায় ত্রিশ - চল্লিশ গুণ বৃদ্ধি পায় । অযোধ্যায় প্রবর্তিত ব্রিটিশ রাজস্ব নীতি এবং এই অঞ্চলের মুখ্য কমিশনার জ্যাকশন সাহেবের অসহানুভূতিপূর্ণ মনোভাবের ফলে তালুকদার ও কৃষকদের দুর্দশার অন্ত ছিল না । চৌকিদারি কর , পথকর , যানবাহন ও অন্যান্য নানা করভার প্রজাদের জীবন দুর্বিষহ করে তোলে । দেশীয় রাজন্যবর্গ শিল্পী , সাহিত্যিক , সংগীতজ্ঞ প্রভৃতি নানা গুণীজনের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন । মন্দির , মসজিদ ও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তাঁরা নিষ্কর ভূমি ও অন্যান্য সাহায্য - দান করতেন । দেশীয় রাজ্যগুলি ধ্বংসের সঙ্গে সঙ্গে এইসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলিও ধ্বংসের মুখোমুখি হয়ে দাঁড়ায় ৷ কর্মচ্যুত হওয়ার পর অবস্থা এমনই দাঁড়িয়েছিল যে , মূল্যবান আসবাবপত্র ও অলঙ্কারসামগ্রী বিক্রির পর এইসব অভিজাত পরিবারের মহিলারা রাত্রির অন্ধকারে অন্যের গৃহে ভিক্ষা করে জীবননির্বাহ করতেন । সুতরাং , এই অবস্থার বিরুদ্ধে জনগণ যে বিদ্রোহী হয়ে উঠবে এ সম্পর্কে কোনও সন্দেহ নেই ।

১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের মহাবিদ্রোহ
ভারতে ব্রিটিশ শক্তির প্রতিষ্ঠা ও বিস্তার

সামাজিক এবং ধর্মীয় কারণ

ভারতে কোম্পানির শাসন প্রবর্তিত হওয়ার সময় ইংরেজরা ভারতবাসী , তাদের আচার - আচরণ ও সামাজিক রীতিনীতিকে তীব্রভাবে ঘৃণা করত । ইংরেজদের চোখে ভারতীয়রা ' বর্বর ' ছাড়া অন্য কিছু ছিল না । ১৭৮০ খ্রিস্টাব্দে রচিত ' সিয়ার - উল - মুতাক্ষরিন ' গ্রন্থে বলা হচ্ছে যে , সামাজিক ও ধর্মীয় ইংরেজরা ইচ্ছে করেই ভারতীয়দের সংস্পর্শ বর্জন করে চলত । স্যার সৈয়দ আহম্মদ খাঁ লিখছেন যে , ইংরেজ রাজকর্মচারীদের সঙ্গে দেখা করতে গেলে সম্ভ্রান্ত ভারতীয়রাও ভীত হয়ে উঠতেন । ১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দে ওয়ারেন হেস্টিংস লিখছেন যে , কয়েক বছর পূর্বেও অধিকাংশ ইংরেজ ভারতীয়দের বর্বর বলেই মনে করত । ভারতীয়দের প্রতি তাদের এই ধরনের বিজেতাসুলভ ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ শাসক ও শাসিতের মধ্যে বিরাট ব্যবধান সৃষ্টি করে । এর ফলে ইংরেজদের সম্পর্কে ভারতীয়দের মনে স্থায়ী সন্দেহ ও অবিশ্বাসের সৃষ্টি হয় — এমনকী তাদের জনহিতকর কার্যাবলীকেও ভারতবাসী সন্দেহের চোখে দেখতে থাকে । খ্রিস্টান ধর্মপ্রচারকদের ধর্মপ্রচারের চেষ্টা ও হিন্দু - মুসলিম ধর্ম সম্পর্কে তাদের বিষোদ্গার ভারতীয় মনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে । ইংরেজি শিক্ষা , স্ত্রীশিক্ষা , বিধবা বিবাহ , হিন্দু উত্তরাধিকার আইন এবং সতীদাহ ও শিশুহত্যা নিবারণ প্রভৃতি আইন — এমনকী রেলওয়ে , টেলিগ্রাম , গঙ্গানদীতে সেচব্যবস্থা প্রবর্তন ভারতীয় মনে ইংরেজদের উদ্দেশ্য সম্বন্ধে এক তীব্র সন্দেহের সৃষ্টি করে । রক্ষণশীল ভারতীয়রা এগুলির মধ্যে হিন্দু ধর্ম , সভ্যতা ও সংস্কৃতির উপর তীব্র আঘাতের আভাস পান ।

সামরিক কারণ

ইংরেজরা একদিন বাহুবলের সাহায্যে ভারতবর্ষ জয় করেছিল এবং ভারতবর্ষে ইংরেজ শাসনের ভিত্তিই ছিল বাহুবল । নানা কারণে সিপাহিদের মধ্যে ব্রিটিশ - বিরোধী মনোভাব তীব্র হয়ে ওঠে ।
( ১ ) দেশীয় সিপাহিদের অধিকাংশ সময়ই বহু দূর প্রদেশে যুদ্ধযাত্রা করতে হত । এই কারণে তারা অতিরিক্ত ভাতা দাবি করে । তাদের এই দাবি না - মঞ্জুর হওয়ায় তাদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয় ।
( ২ ) বেতন , পদমর্যাদা ও অন্যান্য সুযোগ - সুবিধার ব্যাপারে ইংরেজ ও ভারতীয় সৈন্যদের মধ্যে সরকারের বৈষম্যমূলক নীতি ভারতীয় সিপাহিদের বিক্ষুব্ধ করে তোলে ।
( ৩ ) তৎকালীন ভারতীয় সমাজে সমুদ্রযাত্রা জাতিচ্যুত হওয়ারই সামিল ছিল । তা সত্ত্বেও ভারতীয় সৈন্যদের সমুদ্র অতিক্রম করে ব্রহ্মদেশে যুদ্ধের জন্য পাঠানো হলে তাদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয় ।
( ৪ ) প্রথম আফগান যুদ্ধ ( ১৮৩৯ খ্রিঃ) ও ক্রিমিয়ার যুদ্ধে ( ১৮৫৪-১৮৫৬ খ্রিঃ ) ইংরেজ সেনাবাহিনীর সীমাহীন দুঃখ - দুর্দশার কাহিনি ভারতীয় সেনাবাহিনীর মনে আশার সঞ্চার করে । তারা ইংরেজ সৈনিকদের বীরত্বের প্রতি শ্রদ্ধা হারায় এবং তাদের বিরুদ্ধে জয়লাভের আশায় উৎসাহিত হয়ে ওঠে ।
( ৫ ) এই সময় বহু সাধু - সন্ন্যাসী ও দরবেশ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রচার করে বেড়াতেন যে , পলাশির যুদ্ধের একশো বছরের মধ্যে ভারতে ব্রিটিশ শাসন অবলুপ্ত হবে। এই ভবিষ্যৎবাণী সিপাহিদের মনে প্রবল উৎসাহের সঞ্চার করে ।

প্রত্যক্ষ কারণ

বিদ্রোহের ক্ষেত্র পূর্ব থেকেই প্রস্তুত ছিল । ঠিক এই সময় নতুন এনফিল্ড রাইফেল এর প্রবর্তন বিদ্রোহে ইন্ধন জোগায় । এই রাইফেলে যে টোটা ব্যবহৃত হত তার খোলসটি দাঁতে কেটে রাইফেলে ভরতে হত । এই খোলসটি গরু ও শুয়োরের চর্বি দিয়ে তৈরি হত । ধর্মচ্যুত হওয়ার আশঙ্কায় হিন্দু - মুসলিম সিপাহিরা এই টোটা ব্যবহারে অসম্মত হয় । এই টোটা হল মাবিদ্রোহের প্রত্যক্ষ কারণ মূল কারণ বা প্রধান কারণ নয় । স্বনামধন্য সাংবাদিক ও বিশিষ্ট জাতীয়তাবাদী নেতা হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় বলেন যে , বিদ্রোহীদের চোখের সামনে টোটাগুলি ধ্বংস করে ফেলা হলেও বিদ্রোহ ঘটতই , কারণ বিদ্রোহের মূলে ছিল জনগণের প্রবল অসন্তোষ । বলা বাহুল্য , বিদ্রোহীরা কিন্তু ইংরেজদের বিরুদ্ধে এই চৰ্বি - মাখানো টোটাই ব্যবহার করেছে ।

মহাবিদ্রোহের গতি :

১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের ২৬ শে ফেব্রুয়ারি মুর্শিদাবাদের বহরমপুর সেনানিবাসে চর্বি - মাখানো টোটা নিয়ে বিক্ষোভ দেখা দেয় । এরপর ২৯ শে মার্চ ব্যারাকপুরের সেনানিবাসে মঙ্গল পান্ডে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন । তাঁর হাতে একজন ইংরেজ সামরিক কর্মচারী নিহত হন । মঙ্গল পান্ডেকে বিদ্রোহের প্রথম শহিদ হিসেবে গণ্য করা হয় । বহরমপুর ও ব্যারাকপুর সেনানিবাসের এইসব কাজকর্মকে প্রতিবাদমূলক হিসেবে চিহ্নিত করা যায় — পরিকল্পিত বিদ্রোহ এগুলি নয় । ১৮৫৭ খ্রস্টাব্দের ১০ ই মে মিরাট সেনানিবাসেই প্রকৃতপক্ষে বিদ্রোহ শুরু হয় । বিদ্রোহ ক্ৰমে দিল্লি , অযোধ্যা , কানপুর , লক্ষ্ণৌ , বেরিলি , ঝাঁসি , বিহার প্রভৃতি ভারতের এক বিরাট অঞ্চলে বিস্তৃত হয় । বিদ্রোহ দমনের জন্য সরকার কঠোর দমননীতি অবলম্বন করেন । বিদ্রোহীদের বহু ত্যাগ , তিতিক্ষা ও বীরত্বপূর্ণ সংগ্রাম সত্ত্বেও ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসের মধ্যে সমগ্র ভারতে বিদ্রোহ দমিত হয় ।

মহাবিদ্রোহে জনসাধারণের ভূমিকা :

১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের মহাবিদ্রোহে কিছু কিছু অঞ্চলে জনসাধারণ সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করেছিল । লক্ষ্ণৌ , কানপুর , ঝাঁসি , বেরিলি প্রভৃতি স্থানে বিদ্রোহের সূচনা থেকেই নেতৃত্ব ছিল বেসামরিক জনগণের হাতে । অযোধ্যাতে এই বিদ্রোহ প্রকৃত জনযুদ্ধে রূপান্তরিত হয়েছিল — সাধারণ নাগরিক , চাষি , জমিদার সকলেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই বিদ্রোহে যোগ দেয় । ঐতিহাসিক হামস - এর মতে , অযোধ্যায় দেড় লক্ষ বিদ্রোহী প্রাণ দেয় এবং তার মধ্যে সিপাহির সংখ্যা ছিল মাত্র ৩৫ হাজার । উত্তর ও মধ্য ভারতের সর্বত্র সিপাহি ও সাধারণ মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সাধারণ অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে বিদ্রোহে অবতীর্ণ হয় । মুজঃফরনগর , সাহারানপুর , বান্দা , করনাল , ফরাক্কাবাদ , বেরিলি প্রভৃতি এলাকাতে জনসাধারণই প্রথম বিদ্রোহের পতাকা তুলে ধরে এবং সিপাহিদের বিদ্রোহে যোগদানে বাধ্য করে । রেভারেন্ড ডাফ লিখছেন , " এই বিদ্রোহ সিপাহি বিদ্রোহ নয় , এটি একটি যুদ্ধ বা বিপ্লব "। এচিসন লিখছেন যে , এই বিদ্রোহের সময় তারা হিন্দুদের বিরুদ্ধে মুসলিমদের ব্যবহার করতে ব্যর্থ হয়েছেন ।
বিভিন্ন অঞ্চলে জনসাধারণের এই ভূমিকা সত্ত্বেও বলতে হয় যে , বেশ কিছু জনসমর্থন পেলেও সমাজের সর্বস্তরের মানুষ কখনোই এই বিদ্রোহে যোগদান করে নি বা বিদ্রোহীদের সমর্থনও করে নি । মাদ্রাজ , বোম্বাই , বাংলাদেশ ও পশ্চিম পাঞ্জাবে বিদ্রোহের কোনও প্রভাব অনুভূত হয় নি- যদিও এইসব অঞ্চলে সাধারণ মানুষের সমর্থন ছিল বিদ্রোহীদের দিকেই। জমিদার থেকে বঞ্চিত কয়েকজন বিক্ষুব্ধ ভূস্বামী ব্যতীত সমাজের উচ্চ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির অধিকাংশই বিদ্রোহীদের প্রতি বিরূপ ছিল । ধনী সম্প্রদায়ের অধিকাংশই বিদ্রোহের বিপক্ষে ছিল , যারা বিপক্ষে যায় নি তারা বিদ্রোহীদের কোনোপ্রকার সাহায্য করে নি । বণিক শ্রেণিও বিদ্রোহের বিপক্ষে ছিল কারণ বিদ্রোহীরা তাদের উপর অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করেছিল । ইংরেজি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ও বিদ্রোহ সমর্থন করে নি । এ কথা ঠিকই যে , জনসাধারণের একটি বিরাট অংশ এই বিদ্রোহে অংশগ্রহণ করে — যদিও অযোধ্যা ব্যতীত কোথাও তা গণ - বিদ্রোহের রূপ ধারণ করে নি । জমিচ্যুত কৃষক ও জমিদাররা অংশগ্রহণ করে তাদের হৃতসম্পত্তি পুনরুদ্ধারে সচেষ্ট হন । কৃষক ও গ্রামবাসীরা অংশগ্রহণ করে সুদখোর মহাজন ও জমিদারদের বিরুদ্ধে আক্রমণ চালায় এবং দুর্বৃত্তের দলও লুঠতরাজের জন্য এই বিদ্রোহে অংশ নেয় । তবুও বলতে হয় , জনসাধারণের একটি বিরাট অংশ এই বিদ্রোহে যোগদান করে এবং এর বড়ো বিদ্রোহ ইতিপূর্বে ভারত ইতিহাসে সংঘটিত হয় নি ।

মহাবিদ্রোহের নেতৃত্ব :

মহাবিদ্রোহের প্রধান কেন্দ্র ছিল দিল্লি , কানপুর , লক্ষ্ণৌ , বেরিলি , ঝাসি এবং বিহারের আরা । বিদ্রোহী সিপাহিরা দিল্লির গদিচ্যুত বাদশাহ দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ - কে মহাবিদ্রোহের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত করেছিল । তিনি ' নামসর্বস্ব ' নেতা ছিলেন মাত্র — যদিও তাঁর নামেই বিদ্রোহ পরিচালিত হত । দিল্লিতে বিদ্রোেহ পরিচালনার মূল দায়িত্ব ছিল একদল সেনার উপর এবং তাদের নেতা ছিলেন গোলন্দাজ বাহিনীর সুবেদার বখত খান । কানপুরে বিদ্রোহের নেতা ছিলেন পেশোয়া দ্বিতীয় বাজিরাও - এর পোষ্যপুত্র নানাসাহেব তাঁর পক্ষে সেনাপতি তাতিয়া তোপি ও মন্ত্রী হাকিম আজিমুল্লা বিদ্রোহ পরিচালনা করতেন । অযোধ্যার বেগম হজরমহল তাঁর নাবালক পুত্র বরজিস কাদির - কে সিংহাসনে স্থাপন করে নিজেই বিদ্রোহ পরিচালনা করতেন । ঝাঁসিতে বিদ্রোহ পরিচালনার গুরুদায়িত্ব বহন করেন তরুণী বিধবা রানি লক্ষ্মীবাঈ । বিহারের মুখ্য সংগঠক ছিলেন আরা - র নিকটবর্তী জগদীশপুরের পদচ্যুত জমিদার বৃদ্ধ কুনওয়ার সিং । ফৈজাবাদে বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেন বৃদ্ধ মৌলবি আহম্মদুল্লা । আসামে বিদ্রোহীদের দেওয়ান বেরিলি - র নেতা ছিলেন রোহিলা - নায়ক খাঁ বাহাদুর খাঁ

মহাবিদ্রোহের প্রকৃতি :

১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের মহাবিদ্রোহের প্রকৃতি নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদের অন্ত নেই । অনেকের মতে , এটি ছিল নিছক একটি সামরিক বিদ্রোহ । অনেকে আবার ১৮৫৭ - র বিদ্রোহকে জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম বলে অভিহিত করেছেন , আবার অনেকের মতে এটি ছিল নিছক একটি সামস্ত বিদ্রোহ । সমকালীন বিদগ্ধ ভারতীয়দের মধ্যে প্রায় সকলেই — অক্ষয় কুমার দত্ত , ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত , কিশোরীচাদ মিত্র , হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় , শম্ভুচন্দ্র মুখোপাধ্যায় দাদাভাই নওরোজি , সৈয়দ আহমদ , রাজনারায়ণ বসু , দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায় এই বিদ্রোহকে সিপাহি বিদ্রোহ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন । দেশীয় কোনও রাজনৈতিক সংগঠন এই বিদ্রোহ সমর্থন করে নি , শিক্ষিত সম্প্রদায় বিদ্রোহের নিন্দা করেছেন , ভারতের ব্যাপক অঞ্চলে বিদ্রোহের কোনও প্রভাব পড়ে নি এবং দেশের সাধারণ মানুষের সঙ্গেও বিদ্রোহের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল না । এই কারণে এই বিদ্রোহকে সিপাহি বিদ্রোহ বলা হয় ।
কিন্তু এই বিদ্রোহকে নিছক সিপাহি বিদ্রোহ হিসেবে আখ্যায়িত করা যুক্তিসঙ্গত নয় । ইংল্যান্ডের পার্লামেন্টে আলোচনাকালে ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে টোরি পার্টির নেতা ডিসরেলি এই বিদ্রোহকে ' জাতীয় বিদ্রোহ ' বলে অভিহিত করেন । সমকালীন ইংরেজ ঐতিহাসিক নর্টন , ডাফ , আউট্রাম , ম্যালেসন , জন কে , চার্লস বল , হোমস এই বিদ্রোহকে ' জাতীয় বিদ্রোহ ' হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন । বিশিষ্ট মনীষী কার্ল মার্কস দ্ব্যর্থহীন ভাষায় একে ' জাতীয় বিদ্রোহ ' বলেছেন । তিনি বলেছেন যে , ব্রিটিশ শাসকরা 'যাকে সামরিক বিদ্রোহ বলে ভাবছে আসলে সেটি একটি জাতীয় বিদ্রোহ' । তিনি অন্যত্র বলেছেন , 'বর্তমান ভারতীয় অশাস্তিটা সামরিক হাঙ্গামা নয় — জাতীয় বিদ্রোেহ' । তাঁর মতে , বিদ্রোহী সিপাহিরা জাতীয় বিদ্রোহের ' ক্রিয়াশীল হাতিয়ার মাত্র ' । এই বিদ্রোহ কেবলমাত্র সিপাহিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না । ভারতের বিভিন্ন স্থানের জনসাধারণ— বিশেষত অযোধ্যা , রোহিলখণ্ড ও বিহারের জনসাধারণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই বিদ্রোহে যোগদান করে । ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাঈ , নানাসাহেব , কুনওয়ার সিং প্রমুখ রাজন্যবর্গ , বহু জমিদার ও তালুকদার এই বিদ্রোহে যোগ দেন । বিদ্রোহীরা দিল্লির সম্রাট বাহাদুর শাহকে ভারতের সম্রাট বলে ঘোষণা করে ভারতে বিদেশি প্রভাবমুক্ত এক দেশীয় শাসনব্যবস্থা স্থাপনে উদ্যোগী হয় । সুতরাং এই বিদ্রোহকে নিছক সিপাহি বিদ্রোেহ বলা অযৌক্তিক । বীর সাভারকার ( V. D. Savarkar ) প্রমুখ লেখকেরা ১৮৫৭ ক্রিস্টাব্দের  বিদ্রোহকে ' ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ ' বলে অভিহিত করেছেন ।

মহাবিদ্রোহের ( সিপাহী বিদ্রোহের ) ব্যর্থতার কারণ :

মহাবিদ্রোহের ব্যর্থতার পশ্চাতে নানা কারণ বিদ্যমান ছিল ।
( ১ ) এই বিদ্রোহ কয়েকটি নির্দিষ্ট স্থানেই সীমাবদ্ধ ছিল এবং বিদ্রোহীরা সর্বত্র জনসাধারণের সমর্থন বা সহানুভূতি অর্জনে সক্ষম হননি । দাক্ষিণাত্য , পাঞ্জাব , রাজপুতানা , বাংলা , সিন্ধু প্রভৃতি অঞ্চলে বিদ্রোহের কোনও চিহ্ন দেখা যায় নি ।
( ২ ) ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাঈ , নানাসাহেব , বাহাদুর শাহ এবং অযোধ্যার নবাব ব্যতীত অপর কোনও দেশীয় রাজা এই বিদ্রোহে অংশগ্রহণ করেন নি । উপরস্তু সিন্ধিয়া , নিজাম , পাঞ্জাবের শিখ ও নেপালের গুর্খা সৈন্যরা ইংরেজদের সঙ্গে সম্মিলিতভাবে এই বিদ্রোহ দমনে অগ্রসর হয় ।
( ৩ ) বিদ্রোহীদের কোনও সর্বভারতীয় পরিকল্পনা ছিল না । বিভিন্ন সময়ে বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন স্থানে এই বিদ্রোহ শুরু হয় ।
( ৪ ) বিদ্রোহীদের মধ্যে লক্ষ্যের কোনও স্থিরতা ছিল না । বিভিন্ন নেতার লক্ষ্য ছিল বিভিন্ন ধরনের । নানাসাহেবের উদ্দেশ্য ছিল ' পেশোয়া ' পদের পুনঃপ্রতিষ্ঠা , লক্ষ্মীবাঈ চাইতেন নিজ রাজ্যের পুনরুদ্ধার এবং বাহাদুর শাহের লক্ষ্য ছিল মোগল শক্তির পুনরুদ্ধার ।
( ৫ ) সিপাহিদের মধ্যে যোগ্য নেতার অভাব ছিল ৷ নানাসাহেব , লক্ষ্মীবাঈ , তাতিয়া তোপি প্রমুখ নেতারা সাহসী ও সমরকুশলী ছিলেন সন্দেহ নেই , কিন্তু ইংরেজ সেনাপতি লুরেন্স , আউট্রাম , ক্যাম্পবেল , হ্যাভলক , নীল , হিউ রোজ , নিকলসন প্রমুখের তুলনায় তাঁরা কিছুই ছিলেন না ।
( ৬ ) বিদ্রোহীদের আধুনিক অস্ত্রের অভাব ছিল । অপরদিকে , ইংরেজদের গোলা - বারুদ ও আধুনিক সমরাস্ত্রের কোনও অভাব ছিল না ৷
( ৭ ) রেলওয়ে ও টেলিগ্রাফ ব্যবস্থার ফলে ইংরেজরা যে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থাপনে সক্ষম হয় , ভারতীয় সিপাহিদের তা ছিল না ।
( ৮ ) ইংরেজদের কূটকৌশলেও এই বিদ্রোহ ব্যর্থ হয় । বিদ্রোহের সময় ভারতীয়দের ভীতি - প্রদর্শন এবং প্রয়োজনে চাকরি ও পুরস্কারের লোভ দেখিয়ে বিদ্রোহে যোগদান থেকে বিরত করা হয় । এইভাবে শিখদের বিদ্রোহ দমনের কাজে নিয়োগ করা হয় ।

মহাবিদ্রোহের কারণ pdf
সিপাহী বিদ্রোহ pdf

Thanks for your comment. We review and answer your comment.

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post