নাইট্রোজেন চক্র ( Nitrogen Cycle )

নাইট্রোজেন চক্র ( Nitrogen Cycle )

আমাদের চারপাশের যে জগৎ - আলো , বাতাস , মাটি , জল , গাছপালা , পশু - পাখি , কীটপতঙ্গ ইত্যাদি নিয়েই গঠিত হয়েছে আমাদের পরিবেশ । আমরা এই পরিবেশেরই একটি অংশ । বায়ুর গ্যাসীয় উপাদান যেমন - নাইট্রোজেন , হাইড্রোজেন , অক্সিজেন , কার্বন ডাইঅক্সাইড ইত্যাদি ; জলজ সম্পদ , যেমন— বিভিন্ন সামুদ্রিক প্রাণী , মাছ , মুক্তা ঝিনুক ; বনজ সম্পদ , যেমন — বিভিন্ন রকমের গাছপালা , ধুনো , রজন , হিং , পশু - পাখি ; খনিজ সম্পদ , যেমন — কয়লা , পেট্রোল ইত্যাদি এই সমস্তকিছু নিয়ে গঠিত হয় প্রাকৃতিক সম্পদ । আজ মানুষের প্রাকৃতিক সম্পদের যথেচ্ছ ব্যবহার এবং প্রাকৃতিক দুর্ঘটনা যেমন - ভূমিকম্প , দাবানল , অগ্ন্যুৎপাত , বন্যা , খরা ইত্যাদির কারণে এবং দূষণের কবলে পড়ে প্রাকৃতিক সম্পদের পরিমাণ ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে । ফলে পৃথিবীর বুকে নেমে আসতে চলেছে ভয়ংকর বিপদ । এই বিপদের হাত থেকে রক্ষা পেতে হলে পরিবেশের সম্পদগুলির সংরক্ষণ করা একান্ত প্রয়োজন । এখানে নাইট্রোজেন চক্রের চিত্র সহকারে ব্যাখ্যা করা হল যা আমাদের পরিবেশের একটি মুখ্য উপাদান।

নাইট্রোজেন চক্র ( Nitrogen Cycle )

নাইট্রোজেনের প্রধান উৎস হল বায়ুর নাইট্রোজেন এবং মাটির নাইট্রেট লবণ । বায়ুতে নাইট্রোজেনের পরিমাণ 77.17 % । প্রোটোপ্লাজমের অর্থাৎ কোষ গঠনের একটা গুরুত্বপূর্ণ উপাদান নাইট্রোজেন । উদ্ভিদ বা প্রাণী কেউ সরাসরি বায়ুর নাইট্রোজেন শোষণ করতে পারে না । নাইট্রোজেন সংবন্ধনকারী ব্যাকটেরিয়া ( অ্যাজোটোব্যাকটর , ক্লসট্রিডিয়াম ) , নীলাভ সবুজ শৈবাল ( অ্যানাবিনা , নস্টক ) , মিথোজীবী ব্যাকটেরিয়া রাইজোবিয়াম ( শিম্বিগোত্রীয় উদ্ভিদের মূলে বসবাসকারী ) বায়ু থেকে সরাসরি নাইট্রোজেন শোষণ করে মাটিতে আবদ্ধ করে । মাটিতে এই নাইট্রোজেন নাইট্রেট ( NO3 ) রূপে সঞ্চিত হয় । ডিনাইট্রিফাইং প্রক্রিয়ায় নাইট্রেট যৌগ ভেঙে N2 উৎপন্ন হয় এবং বায়ুতে ফিরে যায় । সুতরাং বায়ু থেকে মাটিতে এবং মাটি থেকে বায়ুতে নাইট্রোজেনের আবর্তনকে নাইট্রোজেন চক্র বলে

সংজ্ঞা( Definition ): যে চক্রাকার পদ্ধতিতে বায়ুমণ্ডলের নাইট্রোজেন প্রাকৃতিক উপায়ে ও জীবাণু দ্বারা আবদ্ধ হয়ে মাটিতে মেশে ও সেখান থেকে জীবদেহে প্রবেশ করে এবং জীবদেহ ও মাটি থেকে পুনরায় বায়ুমণ্ডলে আবর্তিত হয় , তাকে নাইট্রোজেন চক্র বলে ।

নাইট্রোজেন চক্রের ধাপসমূহ ( Stages of Nitrogen Cycle ):

1. নাইট্রোজেন সংবন্ধন ( Nitrogen fixation ) :

যে প্রক্রিয়ায় বায়ুর মুক্ত নাইট্রোজেন নাইট্রোজেন ঘটিত যৌগরূপে মাটিতে আবদ্ধ হয় তাকে নাইট্রোজেন সংবন্ধন বা নাইট্রোজেন স্থিতিকরণ বলে । এটি তিনভাবে ঘটে , — প্রাকৃতিক , জীবজ এবং শিল্পজাত

A. প্রাকৃতিক নাইট্রোজেন সংবন্ধন ( Natural Nitrogen fixation ) :

সাধারণত বজ্রপাতের সময় যখন আকাশে বিদ্যুৎস্ফুরণ ঘটে , বায়ুমণ্ডলের নাইট্রোজেন তখন অক্সিজেনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নাইট্রিক অক্সাইড উৎপন্ন করে ।
N2 + O2 → 2NO
এই নাইট্রিক অক্সাইড আবার বায়ুর O2 - এর সংস্পর্শে এসে নাইট্রোজেন ডাইঅক্সাইড তৈরি করে ।
2NO + O2 → 2NO2
এই নাইট্রোজেন ডাইঅক্সাইড জলীয় বাষ্প বা বৃষ্টির জলের সঙ্গে বিক্রিয়ায় নাইট্রাস অ্যাসিড এবং নাইট্রিক অ্যাসিডে পরিণত হয় এবং মাটিতে নেমে আসে ।
2NO2 + H2O → HNO2 + HNO3
এই দুই প্রকার অ্যাসিড মাটির বিভিন্ন খনিজ লবণের ( যথা — পটাশিয়াম , ক্যালশিয়াম ) সঙ্গে বিক্রিয়ায় নাইট্রেট যৌগ গঠন করে এবং মাটিতে নাইট্রোজেনের পরিমাণ বৃদ্ধি করে ।

নাইট্রোজেন চক্র (Nitrogen Cycle)
নাইট্রোজেন চক্র (Nitrogen Cycle)

B. জীবজ নাইট্রোজেন সংবন্ধন ( Biological Nitrogen - fixation ) :

যে পদ্ধতিতে প্রকৃতির মুক্ত N2 ( বায়ুমণ্ডলীয় ) জীবাণু বা নীলাভ - সবুজ শৈবালের ক্রিয়ার ফলে অ্যামোনিয়া - রূপে আবদ্ধ হয় , তাকে জীবজ নাইট্রোজেন সংবন্ধন বা জৈবিক নাইট্রোজেন স্থিতিকরণ বলা হয় । এটি মাটিতে দুটি উপায়ে ঘটে থাকে ।

( i ) স্বাধীনজীবী জীবের দ্বারা : মাটিতে বসবাসকারী কিছু নাইট্রোজেন স্থিতিকারী জীবাণু যথা ক্লসট্রিডিয়াম ( Clostridium ) , অ্যাজোটোব্যাকটার ( Azotobacter ) প্রভৃতি এবং অ্যানাবিনা ( Anabena ) , নস্টক ( Nostoc ) প্রভৃতি নীলাভ - সবুজ শৈবাল বায়ু থেকে সরাসরি মুক্ত N2- কে তাদের দেহকোশে অ্যামোনিয়ারূপে আবদ্ধ করে । এইসব অণুজীবের মৃত্যুর পর সেগুলি মাটিতে সঞ্চিত হয় । এই পদ্ধতিতে বছরে একর প্রতি জমিতে 10-20 kg নাইট্রোজেন স্থিতিকরণ হয় ।

( ii ) মিথোজীবী জীবের দ্বারা : বিভিন্ন প্রজাতির রাইজোবিয়াম ( Rhizobium ) নামক মিথোজীবী ব্যাকটেরিয়া শিম্বিগোত্রীয় ( Leguminosae ) উদ্ভিদের ( ছোলা , মটর , শিম ইত্যাদি ) মূলে উৎপন্ন অর্বুদ বা গুটিতে ( nodules ) আশ্রয় নেয় এবং তাদের উৎপন্ন শর্করাকে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে । বিনিময়ে তারা বায়ুমণ্ডল থেকে মুক্ত নাইট্রোজেনকে অ্যামোনিয়ারূপে আবদ্ধ করে এবং ওই আশ্রয়দাতা উদ্ভিদকে পুষ্টির জন্য সরবরাহ করে । প্রসঙ্গত উল্লেখ্য , কেবল শিম্বিগোত্রীয় উদ্ভিদদেহে ' লেগ হিমোগ্লোবিন ' নামক এক প্রকার প্রাণীদেহের হিমোগ্লোবিন সদৃশ জৈব যৌগ থাকায় কেবল এই গোত্রের উদ্ভিদের মূলেই রাইজোবিয়াম বাসা বাঁধে । অ্যানাবিনা ( Anabaena ) নামক নীলাভ - সবুজ শৈবাল অ্যাজোলা ( Azolla ) নামক জলজ ফার্নের পত্রগহ্বরে এবং সাইকাস নামক ব্যক্তবীজী গাছের মূলে বাস করেও নাইট্রোজেন সংবন্ধন করে থাকে । উল্লেখ্য , এই শৈবালগুলি মুক্ত অবস্থাতেও নাইট্রোজেনকে আবদ্ধ করতে পারে ।

C. শিল্পজাত নাইট্রোজেন সংবন্ধন ( Industrial nitrogen fixation ) :

বিভিন্ন রাসায়নিক কারখানায় নাইট্রোজেনঘটিত সার , যেমন — ইউরিয়া , অ্যামোনিয়া ইত্যাদি সার প্রস্তুত করা হয় । এই সার কৃষিক্ষেত্রে ছড়ানো হয় । ফলে মাটির নাইট্রোজেনের পরিমাণ বৃদ্ধি পায় । এছাড়া সার কারখানা থেকে যে বর্জ্য নিষ্কাশিত হয় তাতেও প্রচুর পরিমাণে নাইট্রোজেন থাকে । এই বর্জ্য নদীতে মেশে এবং বন্যার সময় নদীর চারপাশের নীচু এলাকা প্লাবিত হলে নাইট্রোজেনঘটিত বর্জ্য মাটিতে মেশে ।

2. মাটির নাইট্রোজেন জীবদেহে প্রবেশ :

উদ্ভিদরা মাটি থেকে নাইট্রেট লবণ শোষণ করে নিজেদের দেহে নাইট্রোজেনের চাহিদা মেটায় , প্রাণীরা উদ্ভিদকে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে নিজেদের দেহে নাইট্রোজেনের চাহিদা পুরণ করে ।

3. জীবদেহ থেকে নাইট্রোজেনের মাটিতে পুনঃপ্রবেশ :

প্রাণীদের রেচন পদার্থ এবং মৃত উদ্ভিদ ও প্রাণীদেহের নাইট্রোজেন যৌগগুলি বিয়োজক দ্বারা বিয়োজিত হয়ে প্রথমে অ্যামোনিয়া , পরে নাইট্রাইট , সর্বশেষে নাইট্রেট যৌগ গঠন করে ।

4. অ্যামোনিফিকেশন ( Ammonification ) :

মাটিতে অবস্থিত বিয়োজকদের ( জীবাণু , ছত্রাক ) ক্রিয়ার ফলে মৃত জীবদেহের প্রোটিন অংশ প্রথমে অ্যামাইনো অ্যাসিড এবং পরে অ্যামোনিয়ায় পরিণত হয় । এই পদ্ধতিকে অ্যামোনিফিকেশন বলে । অ্যামোনিফাইং ব্যাকটেরিয়ার উদাহরণ হল — ব্যাসিলাস মাইকয়ডিস ( Bacillus mycoides ) , ব্যাসিলাস র‍্যামোসাস ( Bacillus ramosus ) ।

5. নাইট্রিফিকেশন ( Nitrification ) :

যে পদ্ধতিতে জীবাণুর ক্রিয়ার ফলে মৃত্তিকাস্থ অ্যামোনিয়া প্রথমে নাইট্রাইট ( N2 ) এবং পরে নাইট্রেট ( NO3 ) যৌগে পরিণত হয় , তাকে নাইট্রিফিকেশন বলা হয় । নাইট্রিফাইং ব্যাকটেরিয়ার উদাহরণ হল নাইট্রোসোমোনাস ( Nitrosomonas ) এবং নাইট্রোব্যাক্টার ( Nitrobacter ) ।

6. নাইট্রোজেন মোচন বা ডিনাইট্রিফিকেশন ( Denitrification ) :

মাটিতে বসবাসকারী কিছু জীবাণু মাটিতে আবদ্ধ নাইট্রোজেন যৌগ ভেঙে নাইট্রোজেনকে মুক্ত করে এবং বায়ুমণ্ডলে ফিরিয়ে দেয় । এই পদ্ধতিকে নাইট্রোজেন মোচন বা ডিনাইট্রিফিকেশন বলে , এই ধরনের জীবাণু প্রকৃতপক্ষে ক্ষতিকারক জীবাণু কারণ এরা মাটির উর্বরাশক্তি কমিয়ে দেয় । এই ধরনের কয়েকটি ডিনাইট্রিফাইং জীবাণু হল থায়োব্যাসিলাস ডিনাইট্রিফিক্যান্স ( Thiobacillus denitrificans ) , সিউডোমোনাস ( Pseudomonas ) ইত্যাদি ।

নাইট্রোজেন চক্রের তাৎপর্য ( Significance of Nitrogen Cycle )

( i ) নাইট্রোজেন চক্রের মাধ্যমে প্রকৃতিতে নাইট্রোজেনের ভারসাম্য বজায় থাকে ।
( ii ) জীবদেহের কোশ গঠনের জন্য নাইট্রোজেনের প্রয়োজন । নাইট্রোজেন চক্রের মাধ্যমে নাইট্রোজেন জীবদেহে পরিবাহিত হয় , ফলে যুগ যুগ ধরে জীবকূলের চিরস্থায়িত্ব বজায় থাকে ।

মানুষের ক্রিয়াকলাপ এবং নাইট্রোজেন চক্র ( Human Activities and Nitrogen Cycle )

মানুষের নানা ক্রিয়াকলাপের জন্য , বিশেষ করে নাইট্রোজেনঘটিত সার অধিক পরিমাণে ব্যবহার করার ফলে জীবজগৎ , মাটি , জল ও বায়ুমণ্ডলের মধ্যে আবর্তিত নাইট্রোজেনের পরিমাণ বহু গুণ বেড়ে চলেছে । এর ফলে যেসব ঘটনাগুলি ঘটে চলেছে তা হল –

অ্যাসিড বৃষ্টি
অ্যাসিড বৃষ্টি 

( i ) নাইট্রাস অক্সাইড ( N2O ) , একটি শক্তিশালী গ্রিনহাউস গ্যাস ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে । এছাড়া নাইট্রোজেনের অন্যান্য অক্সাইডগুলির [ নাইট্রিক অক্সাইড ( NO ) ] স্থানভিত্তিক ঘনত্ব বেড়ে গেছে । ফলে বায়ুদূষণের সম্ভাবনা এবং পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়া অবশ্যম্ভাবী ।
( ii ) বিভিন্ন অঞ্চলের মাটি এবং বিভিন্ন নদী আর হ্রদের জলের প্রভূত অম্লীকরণ ( Acidification ) : অ্যাসিড বৃষ্টি , কল কারখানার অ্যাসিড মিশ্রিত জল , রাসায়নিক সার ইত্যাদি মেশার ফলে মাটি এবং নদী ও হ্রদের জলের অম্লতা বৃদ্ধি পায় । অধিক আম্লিক মাটি ফসল চাষের ক্ষতিকারক । জল অধিক অম্ল হয়ে পড়লে জলদূষণ ঘটবে এবং জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণীর মৃত্যু ঘটবে ।

Thanks for your comment. We review and answer your comment.

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post