প্রাণীদের সাড়াপ্রদান এবং রাসায়নিক সমন্বয় - হরমোন

প্রাণীদের সাড়াপ্রদান এবং রাসায়নিক সমন্বয় - হরমোন (Response and chemical coordination in animal hormones)

প্রাণীদেহের ( যেমন — মানুষ ) বিভিন্ন কাজ নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা এবং হরমোনের ভূমিকা [ Need for regulation of different activities of the animal body ( e.g. , Human ) and the role of hormones ]

হরমোনের প্রধান কাজ হল প্রাণীদেহের রাসায়নিক সমন্বয় সাধন করা । হরমোন একটি নির্দিষ্ট স্থান থেকে উৎপন্ন হয়ে দূরে বাহিত হয় এবং প্রাণীদেহের বিভিন্ন কাজ নিয়ন্ত্রণে মুখ্য ভূমিকা গ্রহণ করে । যেমন—
( i ) উত্তেজনায় ত্বকের লোম খাড়া হওয়া ,
( ii ) রক্তে গ্লুকোজের সঠিক মাত্রা বজায় রাখা ,
( iii ) BMR নিয়ন্ত্রণ ,
( iv ) জনন গ্রন্থির বৃদ্ধি ও ক্ষরণ নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি কাজগুলি নিয়ন্ত্রণের জন্য হরমোন মুখ্য ভূমিকা গ্রহণ করে ।
এ ছাড়া হরমোন কোশে কোশে রাসায়নিক সংযোগ সাধন করে বলে , হরমোনকে রাসায়নিক সমন্বায়ক বা রাসায়নিক দূত বলা হয়

প্রাণী হরমোনের প্রধান বৈশিষ্ট্য (Characteristics of animal hormone)

প্রাণী হরমোনের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি হল

1. উৎস ( Source ): প্রাণী হরমোন প্রধানত অন্তঃক্ষরা গ্রন্থি থেকে ক্ষরিত হয় ।
2. রাসায়নিক প্রকৃতি ( Chemical nature ) : হরমোন প্রোটিনধর্মী বা অ্যামাইনোধর্মী বা স্টেরয়েডধর্মী এবং লিপিডধর্মী হয় ( প্রোটিনধর্মী - STH ; অ্যামাইনোধর্মী — অ্যাড্রিনালিন ও থাইরক্সিন ; স্টেরয়েডধর্মী – টেস্টোস্টেরন , প্রোজেস্টেরন , ইসট্রোজেন ; লিপিডধর্মী - প্রোস্ট্যাগ্ল্যান্ডিন ) ।

প্রাণীদের সাড়াপ্রদান এবং রাসায়নিক সমন্বয় - হরমোন

3. পরিবহণের পদ্ধতি ( Mode of transport ) : হরমোন উৎসস্থল থেকে রক্তের মাধ্যমে দেহের বিভিন্ন স্থানে বাহিত হয় । রক্ত থেকে ব্যাপন প্রক্রিয়ায় কোশে প্রবেশ করে ।
4. কাজ ও পরিণতি ব্যাখ্যা ( Functioning and fate ) : হরমোন উৎসস্থল থেকে দূরে বাহিত হয়ে কোশের বিপাকীয় ক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে । হরমোনের কাজ শেষ হলে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় এবং ক্রিয়া স্থান থেকে বেরিয়ে যায় ।
5. বাহক ও নিয়ন্ত্রক হিসেবে হরমোনের ভূমিকা [ Role of hormone as messenger and regulator ( Feedback control ) ] : অধিকাংশ ক্ষেত্রে হরমোন পরোক্ষভাবে নানা গ্রন্থির মাধ্যমে নিজেই নিজের ক্ষরণ নিয়ন্ত্রণ করে । যেমন - পিটুইটারি গ্রন্থির অগ্রখণ্ড থেকে নিঃসৃত TSH ( Thyroid Stimulating Hormone ) থাইরয়েড গ্রন্থি থেকে থাইরক্সিন হরমোনের ক্ষরণ ঘটায় । রক্তে থাইরক্সিনের অধিক মাত্রা পিটুইটারি থেকে TSH ক্ষরণ হ্রাসের মাধ্যমে থাইরয়েড থেকে থাইরক্সিন ক্ষরণ হ্রাস করে । এই ধরনের নিয়ন্ত্রণকে ফিডব্যাক নিয়ন্ত্রণ ( feedback control ) বলে ।

উদ্ভিদ হরমোন ও প্রাণী হরমোনের পার্থক্য ( Differences between plant hormone and animal hormone ) :

বিষয় উদ্ভিদ হরমোন প্রাণী হরমোন
ক্ষরণ স্থান বর্ধনশীল অঙ্গের ভাজক কলা অন্তঃক্ষরা গ্রন্থি
পরিবহন কলারসের মাধ্যমে ব্যাপন প্রক্রিয়ায় পরিবাহিত হয় রক্ত ও লসিকার মাধ্যমে পরিবাহিত হয়
প্রকৃতি জৈব বা অম্ল বা ক্ষারধর্মী প্রোটিন , অ্যামাইনো বা স্টেরয়েডধর্মী
ব্যবহারিক গুরুত্ব ব্যবহারিক প্রয়োগ ব্যাপক ব্যবহারিক প্রয়োগ নগণ্য

যেসব প্রন্থির ক্ষরণ প্রন্থির বাইরে নিঃসৃত হয় না , প্রন্থি থেকে সরাসরি রস্তে মিশে যায় , তাদের অস্তঃক্ষরা বা এন্ডোক্লিন প্রন্থি (endocrine gland) বলে । যেমন : পিটুইটারি , থাইরয়েড , এড্রেনাল গ্রন্থি।
যে সব গ্রন্থির ক্ষরণ গ্রন্থির বাইরে হয় তাদের বহিঃক্ষরা গ্রন্থি বলে। এরা সাধারণত উৎসেচক ক্ষরণ করে।

মানবদেহের অস্তঃক্ষরা গ্রন্থি ও তা থেকে ক্ষরিত হরমোন ( Human endocrine glands and the hormones secreted from them ) :

মানবদেহের অস্তঃক্ষরা গ্রন্থি

  1. হাইপোথ্যালামাস : অগ্র পিটুইটারির হরমোন ক্ষরণ নিয়ন্ত্রণ করে ও পশ্চাদ্ পিটুইটারি হরমোন ( ADH ও অক্সিটোসিন ) উৎপন্ন করে । ওই হরমোনগুলি পশ্চাদ্ পিটুইটারিতে জমা হয় এবং পরবর্তীকালে সেখান থেকে অন্যত্র বাহিত হয় ।
  2. পিটুইটারি : ACTH , GH , TSH , GTH ( FSH , LH , ICSH , LTH / প্রোল্যাকটিন ) , ADH ।
  3. থাইরয়েড : থাইরক্সিন ।
  4. অগ্ন্যাশয়ের অন্তঃক্ষরা কোশ : ( i ) বিটা কোশ – ইনসুলিন । ( ii ) আলফা কোশ — গ্লুকাগন ।
  5. অ্যাড্রেনাল : অ্যাড্রেনালিন , নর - অ্যাড্রেনালিন ।
  6. জনন গ্রন্থি : ( i ) শুক্রাশয় – টেস্টোস্টেরন । ( ii ) ডিম্বাশয় – ইস্ট্রোজেন , প্রোজেস্টেরন ।

অন্তঃক্ষরা গ্রন্থির নাম , অবস্থান , ক্ষরিত হরমোন ও মানবদেহে তাদের ভূমিকা ( The name of endocrine glands , their location , hormones secreted and their role in human body )

হাইপোথ্যালামাস ( Hypothalamus ) : হাইপোথ্যালামাস থেকে নিঃসৃত হরমোন পিটুইটারির হরমোন ক্ষরণ নিয়ন্ত্রণ করায় হাইপোথ্যালামাসকে সুপ্রিম কমান্ডার বা সর্বোচ্চ প্রভুগ্রন্থি বলে ।

অবস্থান : অগ্রমস্তিষ্কে থ্যালামাসের নীচে অবস্থিত ।

ভূমিকা : অগ্র পিটুইটারির হরমোন ক্ষরণ নিয়ন্ত্রণ করে এবং পশ্চাদ্ পিটুইটারির হরমোন ( ADH ও অক্সিটোসিন ) উৎপন্ন করে । হরমোনগুলি পশ্চাদ্ পিটুইটারিতে জমা হয় এবং প্রয়োজনকালে নিঃসৃত হয় ।

হাইপোথ্যালামাস নিঃসৃত হরমোন ও তাদের প্রধান কাজ :

1. অ্যাড্রেনোকর্টিকোট্রফিক রিলিজিং হরমোন ( ARH ) : এটি পিটুইটারির অগ্রখণ্ডকে ACTH ক্ষরণে উদ্দীপিত করে ।

2. থাইরোট্রফিন রিলিজিং হরমোন ( TRH ) : এটি অগ্র পিটুইটারিকে TSH ক্ষরণে উদ্দীপনা জোগায় ।

3. সোমাটোট্রফিন রিলিজিং হরমোন ( SRH ) : এটি অগ্র পিটুইটারিকে STH বা GH ক্ষরণে উদ্দীপনা জোগায় ।

4. গ্রোথ ইনহিবিটিং হরমোন ( GIH ) : এই হরমোন অগ্র পিটুইটারিকে GH ক্ষরণে বাধা দেয় ।

5. গোনাডোট্রফিন রিলিজিং হরমোন ( GnRH ) : এটি পিটুইটারির অগ্রখণ্ডকে FSH ও LH ক্ষরণে উদ্দীপনা জোগায় ।

6. প্রোল্যাকটিন রিলিজিং হরমোন ( PRH ) : এই হরমোন অগ্র পিটুইটারিকে প্রোল্যাকটিন ক্ষরণে উদ্দীপনা জোগায় ।

7. প্রোল্যাকটিন ইনহিবিটিং হরমোন ( PIH ) : এই হরমোন অগ্র পিটুইটারিকে প্রোল্যাকটিন নিঃসরণে বাধা দেয় ।

৪. মেলানোসাইট রিলিজিং হরমোন ( MRH ) : এটি পিটুইটারির মধ্য খণ্ডকে MSH ক্ষরণে উদ্দীপনা জোগায় ৷

9. মেলানোসাইট ইনহিবিটিং হরমোন ( MIH ) : এটি পিটুইটারির মধ্য খন্ডকে MSH ক্ষরণে বাধা দেয় ।

পিটুইটারি ( Pituitary ) :

এই গ্রন্থি নিঃসৃত হরমোন অন্যান্য অস্তঃক্ষরা গ্রন্থির ক্ষরণ নিয়ন্ত্রণ করে বলে এই গ্রন্থিকে মাস্টার গ্ল্যান্ড ( master gland ) বলে ।

অবস্থান : মস্তিষ্কের মূলদেশে করোটির স্ফেনয়েড অস্থির সেলা টারসিকা প্রকোষ্ঠে অবস্থিত ।

পিটুইটারি গ্রন্থি

পিটুইটারি নিঃসৃত হরমোনগুলির মানবদেহে ভূমিকা :

1. ACTH বা অ্যাড্রেনো কর্টিকো ট্রফিক হরমোন ( Adreno cortico Trophica Hormone ) :

অ্যাড্রেনাল গ্রন্থির কর্টেক্স অঞ্চলের বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করে এবং তাকে হরমোন ক্ষরণে উদ্দীপিত করে । এই হরমোনের অধিক ক্ষরণে কুশিং বর্ণিত লক্ষণ ( Cushing's syndrome ) প্রকাশ পায় ।

2. GH বা গ্রোথ হরমোন ( Growth hormone ) :

এই হরমোনের অপর নাম STH বা সোমাটোট্রফিক হরমোন । এই হরমোন শর্করা , প্রোটিন ও ফ্যাট বিপাকে বিশেষ ভূমিকা গ্রহণ করে । এই হরমোনের কম ক্ষরণে বামনত্ব ( dwarfism ) এবং অধিক ক্ষরণে অতিকায় ( gigantism ) বা অ্যাক্রোমেগালি ( acromegaly ) রোগ হয় ।

3. TSH বা থাইরয়েড স্টিমুলেটিং হরমোন ( Thyroid Stimulating Hormone ) :

এই হরমোন থাইরয়েড গ্রন্থির বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করে এবং থাইরয়েড গ্রন্থিকে হরমোন ক্ষরণে উদ্দীপিত করে ।

4. GTH বা গোনাডোট্রফিক হরমোন ( Gonado trophic Hormone ) :

এই গ্রন্থি পুরুষ ও স্ত্রীদেহে অবস্থিত , জননগ্রন্থির ( শুক্লাশয় ও ডিম্বাশয় ) বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করে এবং তাদের হরমোন ক্ষরণে উদ্দীপিত করে । এই হরমোন চার প্রকারের হয় , যথা—
( a ) FSH বা ফলিকল স্টিমুলেটিং হরমোন , যা স্ত্রীদেহে ডিম্বাশয়ে গ্রাফিয়ান ফলিকল বা ডিম্বথলির আয়তন ও সংখ্যা বৃদ্ধিতে সাহায্য করে এবং তাকে উদ্দীপিত করে ইস্ট্রোজেন হরমোন নিঃসরণে সহায়তা করে ।
( b ) LH বা লিউটিনাইজিং হরমোন , যা স্ত্রীদেহে করপাস লিউটিয়াম বা পীতগ্রন্থির বৃদ্ধি ঘটায় এবং তাকে উদ্দীপিত করে প্রাজেস্টেরন হরমোন নিঃসরণে সহায়তা করে ।
( c ) ICSH বা ইন্টারস্টিসিয়াল সেল স্টিমুলেটিং হরমোন , যা পুরুষদেহে শুক্রাশয়স্থিত ইন্টারস্টিসিয়াল কোশসমূহকে উদ্দীপিত করে টেস্টোস্টেরন হরমোনের নিঃসরণ ঘটায় ।
( d ) LTH বা লিউটোট্রফিক হরমোন বা প্রোল্যাকটিন , যা মাতৃদেহে স্তনদুগ্ধ ক্ষরণে সহায়তা করে ।

5. ADH ( Antidiuretic Hormone ) বা ভেসোপ্রেসিন

( a ) বৃক্কীয় নালিকায় জল বিশোষণ ঘটায় । এই হরমোনের কম ক্ষরণে বহুমুত্র বা ডায়াবেটিস ইনসিপিডাস রোগ হয় ।
( b ) রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে ।

6. অক্সিটোসিন ( Oxytocin ) :

প্রসবকালে জরায়ুর সংকোচন ঘটায়

পিটুইটারির নির্যাস মাছকে ইনজেক্ট করে মাছের শুক্রাণু ও ডিম্বাণু নিঃসরণ করানো হয় । পিটুইটারির নির্যাস ইনজেক্ট করে দুগ্ধবতী গাভির দুগ্ধ ক্ষরণ বাড়ানো হয় ।

থাইরয়েড গ্রন্থি ( Thyroid gland ) :

অবস্থান : গ্রীবাদেশে ল্যারিংক্সের নীচে ট্রাকিয়ার দু - পাশে অবস্থিত ।

নিঃসৃত হরমোন : থাইরক্সিন ( T4 ) ।

থাইরয়েড গ্রন্থি (অগ্রদৃশ্য)
থাইরয়েড গ্রন্থি (অগ্রদৃশ্য)

থাইরক্সিনের ভূমিকা ( Role of Thyroxin ) :

1. বিপাকীয় কার্য নিয়ন্ত্রণ

থাইরক্সিন দেহের বিভিন্ন বিপাকীয় কাজগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করে , যেমন–
( i ) ক্রেবস চক্রের সক্রিয়তা বৃদ্ধি করে কলাকোশের বিপাকীয় কাজ নিয়ন্ত্রণ করে , ফলে শর্করা , প্রোটিন ও ফ্যাট বিপাক ক্রিয়ার হার বৃদ্ধি পায় ।
( ii ) অস্ত্রে গ্লুকোজ শোষণ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে ।
( iii ) যকৃতে ও পেশিতে সঞ্চিত গ্লাইকোজেনকে গ্লুকোজে রূপান্তরিত হতে সাহায্য করে ।
( iv ) যকৃতে প্রোটিন থেকে গ্লুকোজ প্রস্তুতিতে সাহায্য করে ।
( v ) থাইরক্সিন দেহের সঞ্চিত মেদ বিয়োজিত করে , ফলে কিটোন বড়ির উৎপাদন বৃদ্ধি পায় ।

2 . মৌল বিপাকীয় হার নিয়ন্ত্রণ :

দেহের তাপ উৎপাদন ও অক্সিজেন ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করে থাইরক্সিন মৌল বিপাকীয় হারের ( BMR ) হ্রাস - বৃদ্ধি ঘটায়

3. লোহিতকণিকার ক্রমপরিণতি :

থাইরক্সিন লোহিত রক্তকণিকার ক্রমপরিণতিতে সাহায্য করে ।

4. হৃৎস্পন্দন বৃদ্ধিঃ

থাইরক্সিনের প্রভাবে হৃৎস্পন্দনের হার বেড়ে যায় , ফলে রক্তচাপ ও শ্বসনের হারও বৃদ্ধি করে ।

থাইরক্সিন হরমোনের কম ক্ষরণের ফলে শিশুদের ক্রেটিনিজম ( cretinism ) এবং প্রাপ্তবয়স্কদের মিক্সিডিমা ) ( myxoedema ) রোগ হয় , থাইরক্সিনের অধিক ক্ষরণে গ্রেভস বর্ণিত রোগ ( Grave's disease ) বা গয়টার ( goitre ) বা গলগণ্ড বৃদ্ধি রোগ হয় । পাহাড়ি এলাকায় বসবাসকারী লোকদের গলগণ্ড বেশি দেখা যায় । কারণ এই অঞ্চলের মাটিতে আয়োডিন থাকে না বললেই চলে । ফলে উৎপন্ন ফসলেও আয়োডিনের ঘাটতি দেখা যায় । থাইরক্সিনের মূল উপাদান আয়োডিন । পাহাড়ি এলাকায় জনগণ আয়োডিনবিহীন খাদ্য গ্রহণ করায় এদের গলগন্ড রোগ হয় ।

অগ্ন্যাশয়ের অন্তঃক্ষরা কোশ ( Endocrine cells of Pancreas ) :

অগ্ন্যাশয়কে মিশ্র গ্রন্থি বলে । কারণ এই গ্রন্থি বহিঃক্ষরা কোশ ও অন্তঃক্ষরা কোশ দিয়ে গঠিত । অগ্ন্যাশয়ের প্রধান অন্তঃক্ষরা কোশ ও তাদের নিঃসৃত হরমোন হল–
( i ) বিটা কোশ ( Beta cells ) : ইনসুলিন ক্ষরণ করে ।
( ii ) আলফা কোশ ( Alfa cells ) : গ্লুকাগন ক্ষরণ করে ।
( iii ) ডেলটা কোশ ( Delta cells ) সোমাটোস্টেটিন হরমোন ক্ষরণ করে ।
থাইরয়েড গ্রন্থি থেকে থাইরক্সিন ছাড়াও ট্রাইআয়োডোথাইরোনিন ( T3 ) এবং ক্যালসিটোনিন ক্ষরিত হয় ।

অগ্ন্যাশয় গ্রন্থির অবস্থান
অগ্ন্যাশয় গ্রন্থির অবস্থান

ইনসুলিনের ভূমিকা ( Role of Insulin ) :

ইনসুলিন একপ্রকার অ্যান্টিডায়াবেটিক হরমোন ( Antidiabetic hormone ) , এই হরমোনের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলি হল—

1. কার্বোহাইড্রেট বিপাক নিয়ন্ত্রণ :

ইনসুলিন কোশপর্দার ভেদ্যতা বৃদ্ধি করে পেশিকোশে গ্লুকোেজ বিশোষণের হার বাড়ায় এবং গ্লাইকোলাইসিস প্রক্রিয়ায় গ্লুকোজকে পাইরুভিক অ্যাসিডে পরিণত হতে সাহায্য করে । এ ছাড়া যকৃত ও পেশিকোশে গ্লাইকোজেনেসিস প্রক্রিয়ায় গ্লুকোজ থেকে গ্লাইকোজেন সংশ্লেষ বৃদ্ধি করে এবং গ্লাইকোজেন থেকে গ্লুকোজ প্রস্তুতি বন্ধ করে । ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা হ্রাস পায় ।

2. প্রোটিন বিপাক নিয়ন্ত্রণ :

যকৃতে নিওগ্লুকোজেনেসিস প্রক্রিয়ায় প্রোটিন ও ফ্যাট থেকে গ্লুকোেজ উৎপন্ন হয় । ফলে রক্তে শর্করার পরিমাণ বৃদ্ধি পায় । ইনসুলিন এই প্রক্রিয়ায় প্রতিবন্ধকরূপে কাজ করে , ফলে রক্তে শর্করার পরিমাণ বাড়তে পারে না ।

3. ফ্যাট বিপাক নিয়ন্ত্রণ

ইনসুলিন মেদকলায় গ্লুকোজ থেকে ফ্যাট প্রস্তুতিতে সাহায্য করে । আবার ফ্যাটের জারণ ক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করে কিটোন বড়ি ( অ্যাসিটোন , অ্যাসেটিক অ্যাসিড ) প্রস্তুতি বন্ধ রাখে । ইনসুলিন কিটোন বড়ি প্রস্তুতিতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির জন্য একে অ্যান্টিকিটোজেনিক হরমোন ( antikitogenic hormone ) বলে ।

অগ্নাশয়ের প্রস্থচ্ছেদ
অগ্নাশয়ের প্রস্থচ্ছেদ

ইনসুলিনের প্রধান কাজ হল : ( i )কোশপর্দার ভেদ্যতা বৃদ্ধি করে কোশে গ্লুকোজ প্রবেশ বৃদ্ধি করে । ( ii ) রক্তের অতিরিক্ত গ্লুকোজকে যকৃৎ ও পেশিতে গ্লাইকোজেনরূপে সঞ্চয় করে রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ বাড়তে দেয় না । ( iii ) যকৃতে নিওগ্লুকোজেনেসিস প্রক্রিয়ায় অশর্করা থেকে গ্লুকোজ উৎপাদনে বাধা সৃষ্টি করে । ( iv ) যকৃতে কিটোন বড়ি উৎপাদনে বাধা সৃষ্টি করে ।

ইনসুলিন কম ক্ষরিত হলে রক্তে শর্করার পরিমাণ বৃদ্ধি পায় , ফলে মধুমেহ বা ডায়াবেটিস মেলিটাস ( Diabetes melitus ) রোগ হয় ।

ডায়াবেটিস মেলিটাস রোগের কয়েকটি বিশেষ লক্ষণ হল — ( i ) মুত্রের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়া , ( ii ) মুত্রে শর্করার উপস্থিতি , ( ii ) প্রবল তৃয়া , ( iv ) যা না শুকানো , ( v ) দেহের ওজন হ্রাস , ( vi ) অতিরিক্ত খিদে পাওয়া ইত্যাদি ।

জানার বিষয় :
*যে প্রক্রিয়ায় গ্লুকোজ থেকে প্লাইকোজেন সংশ্লেষিত হয় তাকে প্লাইকোজেনেসিস বলে ।
* 100 ml রক্তে শর্করার ( গ্লুকোজের ) স্বাভাবিক পরিমাণ হল 80-120mg ।
*যে প্রক্রিয়ায় প্রোটিন ও ফ্যটি ( অশর্করা ) থেকে গ্লুকোজ উৎপন্ন হয় তাকে নিওপ্লুকোজেনেসিস বলে ।

2 গ্লুকাগলের কাজ ( Functions of Glucagon ) :

গ্লুকাগন ইনসুলিনের বিপরীত কাজ করে– ( i ) রক্তে শর্করার পরিমাণ হ্রাস পেলে গ্লাইকোজেনোলাইসিস প্রক্রিয়ায় যকৃতে সঞ্চিত গ্লাইকোজেনকে গ্লুকোজে বিশ্লিষ্ট করে এবং রক্তে সরবরাহ করে ।
( ii ) গ্লুকাগন যকৃতে গ্লুকোনিওজেনেসিস প্রক্রিয়ায় শর্করা ও প্রোটিন থেকে গ্লুকোজ সংশ্লেষ করে ।

ইনসুলিন রক্তে শর্করার পরিমাণ হ্রাস করে এবং গ্লুকাগন রক্তে শর্করার পরিমাণ বৃদ্ধি করে ।

অ্যাড্রেনাল গ্রন্থি ( Adrenal gland ) :

এই গ্রন্থি দুটি স্তর নিয়ে গঠিত । বাইরের স্তরকে কর্টেক্স এবং ভিতরের স্তরকে মেডালা বলে ।

অবস্থান : অ্যাড্রেনাল গ্রন্থি প্রতিটি বৃক্কের ঊর্ধ্বপ্রান্তে অবস্থিত , এই কারণে একে সুপ্রারেনাল গ্রন্থি বলে ।

নিঃসৃত হরমোন : ( i ) অ্যাড্রেনালিন , ( ii ) নর - অ্যাড্রেনালিন ।

অ্যাড্রেনাল গ্রন্থির অবস্থান
অ্যাড্রেনাল গ্রন্থি

অ্যাড্রেনালিনের কাজ ( Functions of Adrenalin ) :

স্বাভাবিক অবস্থায় অ্যাড্রেনালিনের ভূমিকা খুবই নগণ্য । কিন্তু রাগ , ভয় , আনন্দ , দুশ্চিন্তা প্রভৃতি উত্তেজনাকালে এই হরমোনের ক্ষরণ বেড়ে যায় । এই হরমোনের ক্রিয়াশীলতা দীর্ঘস্থায়ী নয় , জরুরিকালীন অবস্থায় এই হরমোন দ্রুত ক্রিয়াশীল হয় , আবার জরুরি অবস্থা দুর হলে এর ক্রিয়াশীলতাও হ্রাস পায় , এই কারণে অ্যাড্রেনালিনকে জরুরিকালীন বা সংকটকালীন হরমোন ( emergency hormone ) বলে ।

এই হরমোনের প্রধান কাজগুলি হল—

( i ) রক্ত সংবহনতন্ত্রের উপর প্রভাব :

অ্যাড্রেনালিন হার্দ - উৎপাদ ( cardiac output ) বৃদ্ধি করে এবং রক্তবাহকে সংকুচিত করে রক্তচাপকে বাড়িয়ে দেয় ।

( ii ) শ্বাসক্রিয়ার ওপর প্রভাব :

অ্যাড্রেনালিন ব্রংকিওলের পেশিকে শিথিল করে তাদের গহ্বরকে প্রসারিত করে । হাঁপানির সময় অ্যাড্রেনাল ব্রংকিওলগুলিকে প্রসারিত করে শ্বাসকষ্ট লাঘব করে ।

( iii ) অস্থিপেশির ওপর প্রভাব :

অ্যাড্রেনালিনের প্রভাবে পেশির উত্তেজিতা ও সংকোচনশীলতা বৃদ্ধি পায় এবং পেশির অসাড়কাল বিলম্বিত হয় ।

( iv ) বিপাকের ওপর প্রভাব :

অ্যাড্রেনালিন BMR বৃদ্ধি করে এবং গ্লাইকোজেনোলাইসিস ঘটিয়ে রক্তে শর্করার পরিমাণ বাড়ায় ।

( v ) চক্ষুর ওপর প্রভাব :

এই হরমোন তারারন্ধ্রকে প্রসারিত করে এবং অশ্রুগ্রন্থির ক্ষরণ বৃদ্ধি করে ।

( vi ) ত্বকের ওপর প্রভাব :

এই হরমোন ত্বকের অ্যারেকটোরেস পিলাই ( arrectores pilli ) পেশির সংকোচন ঘটিয়ে ত্বকের রোমকে খাড়া করে । এই কারণে কুকুর , বিড়াল ইত্যাদির রোম খাড়া হয় ।

নর - অ্যাড্রেনালিনের কাজ ( Functions of Nor - adrenalin ) :

নর - অ্যাড্রেনালিনের বিশেষ কয়েকটি কাজ হল–
( i ) দেহের বিপাকীয় ক্রিয়ার হার বৃদ্ধি করে ।
( ii ) সিস্টোলিক ও ডায়াস্টোলিক রক্তচাপ বৃদ্ধি করে ।
( iii ) হৃদ্‌পেশিকে উত্তেজিত করে এবং প্লিহার মসৃণ পেশির সংকোচন ঘটায় ।
( iv ) যকৃৎ ও কঙ্কাল পেশিতে গ্লাইকোজেনোলাইসিসের হার বৃদ্ধি করে ।

জনন গ্রন্থি ( Reproductive glands )

শুক্রাশয় ও ডিম্বাশয় অস্তঃক্ষরা গ্রন্থিরূপে কাজ করে ।

( a ) শুক্রাশয় ( Testis ) :

অবস্থান : দেহগহ্বরের বাইরে স্ক্রোটাম নামক থলির মধ্যে অবস্থিত । জন্মের পূর্বে শুক্লাশয় দুটি উদরগহ্বরে অবস্থান করে ।

নিঃসৃত হরমোন : টেস্টোস্টেরন ।

শুক্রাশয়

টেস্টোস্টেরনের কাজ ( Functions of testosterone ) :

টেস্টোস্টেরনের প্রধান কাজগুলি হল –

( i ) পুরুষের যৌনাঙ্গের পরিবর্ত :

টেস্টোস্টেরনের প্রভাবে পুরুষের প্রধান যৌনাঙ্গের ( শিল্প ও শুক্রাশয় ) এবং আনুষঙ্গিক যৌনাঙ্গের ( কাউপার গ্রন্থি , প্রস্টেট গ্রন্থি ) বৃদ্ধি ঘটে ।

( ii )গৌণ যৌনলক্ষণের প্রকাশ

টেস্টোস্টেরন পুরুষদের গৌণ যৌনলক্ষণ প্রকাশে সহায়তা করে । ফলে পুরুষদের পেশিবহুল দেখায় , গলার স্বর মোটা হয় এবং গোঁফ - দাড়ি গজায় ।

( iii ) মৌল বিপাকীয় হার :

টেস্টোস্টেরন দেহে মৌল বিপাকীয় হার এবং প্রোটিন সংশ্লেষ করে ।

( b ) ডিম্বাশয় ( Ovary ) :

অবস্থান :স্ত্রীদেহে শ্রোণিগহ্বরে জরায়ুর দু - পাশে অবস্থিত ।

নিঃসৃত হরমোন :ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরন ।

ডিম্বাশয়

ইস্ট্রোজেনের কাজ ( Functions of Oestrogen ) :

ইস্ট্রোজেনের প্রধান কাজগুলি হল-

( i ) দৈহিক পরিবর্তন :

ইস্ট্রোজেনের প্রভাবে নারীদের ত্বক কোমল ও মসৃণ হয় , স্তনগ্রন্থিতে স্নেহদ্রব্য সঞ্চিত হয় , স্তনগুলি আকারে বৃদ্ধি পায় , জরায়ুর আকৃতি বৃদ্ধি পায় ।

( ii ) ঋতুচক্র নিয়ন্ত্রণ :

এই হরমোনের প্রভাবে স্ত্রীদেহে ঋতুচক্রের আবর্তন নিয়মিত হয় ।

( iii ) ইস্ট্রোজেনের প্রভাবে স্তনগ্রন্থির বিকাশ ঘটে ৷

( iv ) ইস্ট্রোজেন নারীদেহে প্রোটিন সংশ্লেষ বৃদ্ধি করে ।

প্রোজেস্টেরনের কাজ ( Functions of Progesterone ) :

প্রোজেস্টেরনের প্রধান কাজগুলি হল—

( i ) এই হরমোন স্ত্রীদেহে অমরা বা প্লাসেন্টা ( placenta ) গঠনে ও গর্ভাবস্থায় ভ্রুণের বৃদ্ধি ও পুষ্টিতে সাহায্য করে ।

( ii ) এই হরমোনের প্রভাবে ডিম্বাশয়ে ডিম্ব উৎপাদন হয় এবং গর্ভাবস্থায় ঋতুচক্র বন্ধ থাকে ।

( iii ) গর্ভাবস্থায় স্তনগ্রন্থির প্রসারণ এবং প্রসবকালে জননপথের পেশির প্রসারণে এই হরমোনের বিশেষ ভূমিকা আছে ।

বিভিন্ন হরমোনের ক্ষরণজনিত অস্বাভাবিকতার কারণ ও উপসর্গ ( Causes and symptoms of the a following hormonal disorders ) :

বামনত্ব , ডায়াবেটিস ইনসিপিডাস , গলগণ্ড , মধুমেহ ( ডায়াবেটিস মেলিটাস ) ( Dwarfism , Diabetes insipidus , Goitre , Diabetes mellitus ) :

রোগের নাম কারণ উপসর্গ
1. বামনত্ব ( Dwarfism ) অগ্র পিটুইটারি নিঃসৃত STH বা গ্রোথ হরমোনের কম ক্ষরণের ফলে হয়ে থাকে । দৈর্ঘ্যে বৃদ্ধি হ্রাস পায় । 20 বছর বয়সে যে বৃদ্ধি হয় তা 7-10 বছর বয়সের সমতুল্য হয় ।
2. ডায়াবেটিস ইনসিপিডাস ( Diabetes incipidus ) পশ্চাৎ পিটুইটারি থেকে ADH ( Anti Diuretic Hormone ) হরমোনের কম ক্ষরণের ফলে হয় । ADH- এর অভাবে বৃক্কীয় নালিকার পুনঃশোষণ ক্ষমতা হ্রাস পায় , ফলে অধিক পরিমাণে বার বার মুত্র ত্যাগ হয় । এই অবস্থাকে বহুমূত্র বা ডায়াবেটিস ইনসিপিডাস বলে ।
3. গলগণ্ড বা গয়টার ( Goitre ) থাইরয়েড গ্রন্থি থেকে থাইরক্সিন নিঃসরণ হ্রাস পেলে আয়োডিন বিপাক ব্যাহত হয় । আয়োডিনের অভাবে গলগণ্ড রোগ হয় । থাইরয়েড গ্রন্থির আকার ও আয়তন বৃদ্ধি পায় , BMR হ্রাস পায় , হৃদ্‌গতি হ্রাস পায় ।
4. মধুমেহ বা ডায়াবেটিস মেলিটাস ( Diabetes mellitus ) অগ্ন্যাশয়ের বিটা কোশ থেকে নিঃসৃত ইনসুলিন হরমোনের কম ক্ষরণে এই রোগ হয় । ( i ) রক্তে শর্করার পরিমাণ বেড়ে যায় ( রক্তে শর্করার 12 স্বাভাবিক পরিমাণ হল 100 cc রক্তে 80–120mg ) ।
( ii ) মুত্রের সঙ্গে শর্করা নির্গত হয় ।
( iii ) অতিরিক্ত তৃয়া ।
( iv ) ঘন ঘন মুত্র ত্যাগ ।
( v ) কেটে গেলে ঘা শুকোয় না ।
( vi ) ওজন কমে যাওয়া ।
( vii ) অতিরিক্ত খিদে পাওয়া ।

অন্তঃক্ষরা ও বহিঃক্ষরা গ্রন্থির পার্থক্য ( Differences between endocrine and exocrine glands ) :

বিষয় অন্তঃক্ষরা গ্রন্থি বহিঃক্ষরা গ্রন্থি
1. নালির উপস্থিতি ও অনুপস্থিতি নালি থাকে না । নালি থাকে ।
2. কাজের স্থান এই প্রকার গ্রন্থির ক্ষরণ পদার্থ উৎসস্থল থেকে দুরবর্তী স্থানে ক্রিয়া করে । এই প্রকার গ্রন্থি যে রস ক্ষরণ করে তা নালি দিয়ে গ্রন্থির বাইরে আসে এবং উৎপত্তিস্থলে এবং উৎপত্তিস্থল থেকে দূরবর্তী স্থানে ক্রিয়া করে ।
3. ক্ষরিত পদার্থ এই প্রকার গ্রন্থির ক্ষরিত পদার্থ হল হরমোন । এই প্রকার গ্রন্থির ক্ষরিত পদার্থ হল উৎসেচক পুর্ণ রস , যেমন- লালারস , অগ্ন্যাশয় রস , পাকরস , আন্ত্রিক রস ইত্যাদি ।

Thanks for your comment. We review and answer your comment.

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post