দক্ষিণ ভারতের চালুক্য , রাষ্ট্রকূট , পল্লব ও চোল বংশ

বাতাপির আদি চালুক্য বংশ

গুপ্তদের পতনের পর দাক্ষিণাত্য চালুক্য দের নেতৃত্বে এক নতুন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা হয়। তারা রাজপুতদের একটি শাখা ছিল। তাদের রাজধানী ছিল বর্তমান বিজাপুর জেলার বাতাপী ( বর্তমান নাম বাদামি )। প্রথম স্বাধীন রাজা ছিলেন প্রথম পুলকেশী ( ৫৩৫-৫৩৩ খ্রিস্টাব্দ )। তাঁর পুত্র কীর্তিবর্মন ( ৫৬৬-৫৯৭ ) প্রকৃতপক্ষে তিনিই ছিলেন এই বংশের প্রকৃত শক্তি এবং প্রতিপত্তির স্থাপয়িতা। কীর্তিবর্মনের পর তাঁর ভ্রাতা মঙ্গলেশ সিংহাসনে বসেন এবং কীর্তিবর্মনের পুত্র দ্বিতীয় পুলকেশীর সঙ্গে সিংহাসন বিবাদে ( ৬১০ ) মঙ্গলেশ নিহত হয়।

দ্বিতীয় পুলকেশী

দ্বিতীয় পুলকেশী ছিলেন চালুক্য বংশের সর্বশ্রেষ্ঠ নরপতি। তাঁর সভাকবি রবিকীর্তি রচিত "আইহোল শিলালিপি" থেকে তাঁর কৃতিত্বের কথা জানা যায়। কৌনজ রাজ হর্ষবর্ধন দাক্ষিণাত্য জয়ে অগ্রসর হলে দ্বিতীয় পুলকেশীর কাছে তিনি পরাজিত হয়। তিনি পল্লব রাজ মহেন্দ্রবর্মন কে পরাস্ত করে তাঁর রাজধানী কাঞ্চি দখল করে। মাহেন্দ্রবর্মনের পুত্র প্রথম নরসিংহবর্মন পিতার পরাজয়ের প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য চালুক্য রাজধানী বাতাপী আক্রমণ করেন , বাতাপী ধ্বংশ করেন এবং দ্বিতীয় পুলকেশী নিহত হয় ( ৬৪২ খ্রিস্টাব্দ ) এবং নরসিংহবর্মন "বাতাপীকোন্ড" বা বাতাপী-বিজেতা উপাধী ধারণ করে। হর্ষকে উত্তরাপথনামা বলা হলে তাঁকে "দক্ষিণপথনামা" বলা চলে। তিনি শৈব হলেও বৌদ্ধধর্মের প্রতি যথেষ্ঠ সন্মান প্রদর্শন করেন।

◼ দ্বিতীয় পুলকেশীর মৃত্যুর পর প্রথম বিক্রমাদিত্য ও তাঁর পুত্র দ্বিতীয় বিক্রমাদিত্য ( ৭৩৩-৭৪৬ ) সিংহাসনে বসেন।

◼ চালুক্য এবং পল্লব দ্বন্দ অষ্টম শতাব্দী পর্যন্ত অব্যহত থাকে এবং দুই পক্ষই দুর্বল হয়ে পড়ে। এই সুযোগে অষ্টম শতাব্দীর মধ্যেভাগে মান্যখেটের রাষ্ট্রকূট বংশ দাক্ষিণাত্য নিজ প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করে ( ৭৫৩ খ্রিস্টাব্দ )।

◼◼ প্রথম পুলকেশী ⟶ কীর্তিবর্মন⟶ মঙ্গলেশ ⟶ দ্বিতীয় পুলকেশী ⟶ প্রথম বিক্রমাদিত্য ⟶ দ্বিতীয় বিক্রমাদিত্য ⟶ দ্বিতীয় কীর্তিবর্মন

রাষ্ট্রকূট বংশ

রাষ্ট্রকূটরা চালুক্যদের অধীনে সামন্ত রাজা ছিল। দন্তিদুর্গ ছিলেন এই বংশের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা। তিনি দ্বিতীয় বিক্রমাদিত্যর সামন্ত ছিলেন এবং তাঁর মৃত্যুর পর স্বাধীন রাজ্যজয় চালু করেন। চালুক্য রাজ দ্বিতীয় কীর্তিবর্মন তাঁর শক্তি বৃদ্ধিতে আতঙ্কিত হয়ে যুদ্ধযাত্রা করেন এবং খান্দেসের যুদ্ধে পরাজিত হন। দন্তিদুর্গের পুত্র প্রথম কৃষ্ণ দ্বিতীয় কীর্তিবর্মনকে পরাজিত করে সমগ্র মহারাষ্ট্রে নিজ অধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন। এর ফলে চালুক্য বংশের পতন ঘটে। তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র প্রথম ধ্রুব সমগ্র দক্ষিণাত্য নিজ কতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করেন। ধ্রুব এর পর এই বংশের পরাক্রান্ত নৃপতি তৃতীয় গোবিন্দ ( ৭৯৩-৮১৪ খ্রিস্টাব্দ )। তিনি প্রতিহার রাজ নাগভট্ট এবং পাল রাজ ধর্মপাল তাঁর অনুগত্য মেনে নেয়। তাকে বিনাবাক্য রাষ্ট্রকূট বংশের সর্বশ্রেষ্ঠ রাজা হিসাবে গণ্য করা হয়। তৃতীয় গোবিন্দ এর মৃত্যুর পর প্রথম অমোঘবর্ষ নাসিক থেকে মান্যখেটে রাজধানী স্থানান্তরিত করেন। তিনি 'রত্নমালিক' 'কবিরাজমার্ক' নামে দুটি গ্রন্থ রচনা করেন।

◼ এরপর উল্লেখযোগ্য রাজা হলেন তৃতীয় কৃষ্ণ। তিনি নিজেকে সকল দক্ষিণ দিগাধীপতি বলে অভিহিত করেন।

◼ তৃতীয় কৃষ্ণের মৃত্যুর পর ৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে কল্যাণের পরবর্তী চালুক্য বংশীয় রাজা দ্বিতীয় তৈল বা তৈলপ শেষ রাষ্ট্রকূট রাজ অমোঘবর্ষ বা কার্ক কে পরাজিত করে রাষ্ট্রকূট রাজ্যের বিলোপ ঘটায়।

◼◼ দন্তিদুর্গ ⟶ প্রথম কৃষ্ণ ⟶ দ্বিতীয় গোবিন্দ ⟶ প্রথম ধ্রুব ⟶ তৃতীয় গোবিন্দ ⟶ প্রথম অমোঘবর্ষ ⟶ তৃতীয় কৃষ্ণ ⟶ অমোঘবর্ষ বা কার্ক

কল্যাণের পরবর্তী চালুক্য বংশ

কল্যাণের চালুক্য বংশ বাতাপীর চালুক্য বংশেরই একটি শাখা। ৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে চালুক্য বংশধর দ্বিতীয় তৈল বা তৈলপ রাষ্ট্রকূট রাজ কার্ককে পরাজিত করে হায়দ্রাবাদ রাজ্যের অন্তর্গত কল্যাণ বা কল্যাণী ছিল এই রাজ্যের রাজধানী। ষষ্ঠ বিক্রমাদিত্য এই বংশের (১০৭৬-১১২৮) সর্বশ্রেষ্ঠ নরপতি। তাঁর সভাকবি বিহ্লন এর "বিক্রমাঙ্কদেব চরিত" গ্রন্থ থেকে তাঁর প্রতিভা ও কৃতিত্বের কথা জানা যায়। বিহ্লন ছাড়াও মিতাক্ষরা গ্রন্থের রচয়িতা বিজ্ঞানেশ্বর তাঁর রাজসভা অলংকৃত করেন।

দক্ষিণ ভারতের চালুক্য , রাষ্ট্রকূট , পল্লব ও চোল বংশ

সুদূর দক্ষিণ

বিন্ধ পর্বতের দক্ষিণে অবস্তিত দক্ষিণ ভারতকে দু'ভাগে ভাগ করা যায়। বিন্ধ পর্বত থেকে তুঙ্গভদ্রা নদী পর্যন্ত বৃস্তিত ভূ-ভাগকে দাক্ষিণাত্য এবং তুঙ্গভদ্রার দক্ষিণে অবস্তিত অঞ্চলকে সুদূর দক্ষিণ।

কাঞ্চির পল্লব বংশ

◼ সাতবাহন বংশ পতনের পর খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতকের প্রথমার্থে পল্লব সাম্রাজ্যের সূচনা হয় কৃষ্ণা নদীর দক্ষিণে কাঞ্চিকে কেন্দ্র করে। এই বংশের প্রথম নৃপতি ছিলেন শিবসুন্দবর্মন। এরপর বিষ্ণুগোপ এর নাম পাওয়া যায়। সমুদ্রগুপ্ত বিষ্ণুগোপকে পরাজিত করেছিলেন।

◼ ৫৭৫ খ্রিস্টাব্দে সিংহবিষ্ণু কাঞ্চির সিংহাসনে বসেন। তার থেকেই কাঞ্চির গৌরব ও অধিপত্য সূচনা হয়। বিখ্যাত কবি ভারবি তার সভাকবি ছিলেন। পরবর্তী রাজা প্রথম মহেন্দ্রবর্মন (৬০০-৬৩০) এর সময় থেকেই চালুক্য পল্লব প্রতিদ্বন্ধিতা শুরু হয়। চালুক্য রাজ দ্বিতীয় পুলকেশীর হস্তে তিনি পরাজিত হন। বিবিধ গুণাবলীর অধিকারী মহেন্দ্রবর্মন ত্রিচিনোপল্লী , আর্কট ও চিঙ্গলপেট জেলায় বহু মন্দির নির্মাণ করেন। তিনি ব্যাঙ্গ-নাটক মাত্তবিলাস প্রহসন সংস্কৃত ভাষায় রচনা করেন। তিনি গুনভার উপাধী ধারণ করেন। বিবিধ গুণাবলীর জন্য জনসাধারণ তাকে 'বিচিত্রচিত্ত' বলত। বহু মন্দির নির্মাণের জন্য তিনি চৈত্যকারী বলে পরিচিত ছিল।

◼ মহেন্দ্রবর্মনের পুত্র প্রথম নরসিংহবর্মন (৬৩০-৬৬৮) এই বংশের সর্ব শ্রেষ্ঠ রাজা। তিনি চালুক্য রাজ দ্বিতীয় পুলকেশীকে হারিয়ে (৬৩২) "বাতাপিকোন্ড" উপাধী নেয়। মহাবলীপুরমের বিখ্যাত রথ মন্দির তার আমলেই তৈরী হয়।

◼ নরসিংহবর্মনের পুত্র দ্বিতীয় মহেন্দ্রবর্মন এর দুই বছর পর প্রথম পরমেশ্বরবর্মন সিংহাসনে বসেন।

◼ প্রথম পরমেশ্বরবর্মনের পুত্র দ্বিতীয় নরসিংহবর্মন (৬৯৫-৭২২) 'রাজসিংহ' উপাধী নিয়ে সিংহাসনে বসেন। তাঁর আমলে বিখ্যাত কৈলাসনাথের মন্দির তৈরী হয়। তিনি মহাবলীপুরমের রথমন্দিরের নির্মাণ কাজ সমাপ্ত করেন। বিখ্যাত সংস্কৃত পণ্ডিত দন্ডি সম্ভবত তাঁর সভাকবি ছিলেন।

◼ পরবর্তী উল্লেখযোগ্য রাজা হলেন দ্বিতীয় নন্দীবর্মন। তিনি মুক্তশ্বরের মন্দিরটি নির্মাণ করেন।

◼ নন্দীবর্মনের মৃত্যুর পর চোল এবং পান্ডদের আক্রমণ এবং সামন্ত রাজাদের বিরোধীতায় পল্লব শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। চোল সামন্ত আদিত্য (৮৯১ খ্রিস্টাব্দ ) শেষ পল্লব রাজ অপরাজিতা কে হত্যা করে পল্লব শক্তিকে ধ্বংশ করে এবং দক্ষিণাত্য চোল অধিপত্য স্থাপন করে।

◼◼ সিংহবিষ্ণু ⟶ প্রথম মহেন্দ্রবর্মন ⟶ প্রথম নরসিংহবর্মন ⟶ দ্বিতীয় মহেন্দ্রবর্মন ⟶ প্রথম পরমেশ্বরবর্মন ⟶ দ্বিতীয় নরসিংহবর্মন ⟶ দ্বিতীয় পরমেশ্বরবর্মন ⟶ দ্বিতীয় নন্দীবর্মন ⟶ অপরাজিতা

তাঞ্জোরের চোল বংশ

চোল রাজ্যের প্রথম ঐতিহাসিক রাজা ছিলেন কারিকল। তারপর চালুক্য , রাষ্ট্রকূট ও পল্লবদের আক্রমণে তারা হীনবল হয়ে পড়ে। খ্রিস্টীয় নবম শতাব্দীর মধ্যভাগে তারা পুনরুত্থান করে , এর মুলে ছিল বিজয়ালয় এবং তাঁর পুত্র প্রথম আদিত্য। প্রথম আদিত্য তার প্রভু পল্লবরাজ অপরাজিতাকে যুদ্ধে পরাজিত করে সার্বভৌমত্ব ঘোষণা করে। আদিত্যের পুত্র প্রথম পারান্তক পাণ্ড্য রাজ্য জয় করে মাদুরাইকোন্ড উপাধী নেয়। চোল শক্তি বৃদ্ধিতে আতঙ্কিত রাষ্ট্রকূট রাজ তৃতীয় কৃষ্ণ ও মহীশূরের রাজ যৌথ ভাবে ৯৪৯ খ্রিস্টাব্দে তাক্কোলোমের যুদ্ধে পারান্তকে পরাজিত করে। এই যুদ্ধে যুবরাজ রাজাদিত্য নিহত ও তাঞ্জোর অধিকৃত হয় এবং চোল রাজ পারান্তক ৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে ভগ্নহৃদয়ে মৃত্যুবরণ করেন।

প্রথম রাজরাজ (৯৮৫-১০১৪ খ্রিস্টাব্দ )

৯৮৫ খ্রিস্টাব্দে দ্বিতীয় পরান্তকের পুত্র প্রথম রাজরাজ সিংহাসনে বসলে চোল ইতিহাসে স্বর্ণযুগের সূচনা হয়। তাকেই চোল সাম্রাজ্যের প্রকৃত স্থাপয়িতা বলা হয়। তাঁর তাঞ্জোর লিপিতে তাঁর সামরিক কৃতিত্বের বিবরণ পাওয়ায়। তাঁর অন্যতম কৃতিত্ব হল শক্তিশালী নৌ-বাহিনী গঠন। প্রথম রাজরাজ এর কৃতিত্বেই চোল রাজ্য একটি আঞ্চলিক রাজ্য থেকে একটি সাম্রাজ্য রূপান্তরিত হয়। তিনি সিংহলের রাজধানী 'অনুরাধাপুর' দখল করেন। তাঞ্জোরের বিখ্যাত রাজরাজেশ্বর মন্দিরটি তিনি নির্মাণ করেন। ধৰ্ম বিশ্বাসে তিনি শৈব ছিলেন।

প্রথম রাজেন্দ্র চোল (১০১৪-১০৪৪ খ্রিস্টাব্দ )

প্রথম রাজরাজ এর পুত্র প্রথম রাজেন্দ্র চোল ছিল চোল বংশের সর্বশ্রেষ্ঠ নরপতি। তাঁর উপাধী ছিল ' মার্তণ্ড ' , ' উত্তর চোল ', ' গাঙ্গেই কোন্ডচোল '। তিরুমালা পার্বতলিপি ও তাঞ্জোর লিপি থেকে তার কার্যকলাপের বিবরণ পাওয়া যায়। তিনি পূর্ব বঙ্গের গোবিন্দ চন্দ্র , পশ্চিম বঙ্গের প্রথম মহিপাল ও দক্ষিণ বঙ্গের রনশূর কে পরাজিত করে " গাঙ্গেইকোন্ডচোল " বা ' গঙ্গা বিজেতা চোল নৃপতি ' উপাধী নেয়। তিনি সিংহল , ব্রহ্মদেশ এবং আন্দামান নিকোবর জয় করে বঙ্গোপসাগরকে বঙ্গ হ্রদে পরিণত করেন। তিনি মালব , সুমাত্রা ও জাভায় তার অধিপত্য স্থাপন করেন।

রাজেন্দ্র চোলের মৃত্যুর পর তাঁর তিন পুত্র রাজাধিরাজ চোল , দ্বিতীয় রাজেন্দ্র এবং বীর রাজেন্দ্র সিংহাসনে বসেন। দীর্ঘদীন ধরে চোল-চালুক্য সংঘর্ষের ফলে চোল সাম্রাজ্য ধ্বংশ হয়ে পড়ে। এরপর সিংহাসনে বসেন কুলোতুঙ্গ (১০৭০-১১২২ )। তিনি ছিলেন রাজেন্দ্র-র দৌহিত্র এবং বেঙ্গির চালুক্য রাজ প্রথম রাজরাজ এর পুত্র। তাই তাকে চোল-চালুক্য বংশের প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়।

Thanks for your comment. We review and answer your comment.

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post