শশাঙ্ক ও হর্ষবর্ধন

শশাঙ্ক ও হর্ষবর্ধন

গুপ্ত সম্রাট স্কন্দ গুপ্তের মৃত্যুর পর গুপ্ত সাম্রাজ্য দ্রুত পতনের দিকে অগ্রসর হয় এবং পুষ্যমিত্র ও হুন আক্রমণে সাম্রাজ্য একেবারে ভেঙে পাড়ে। গুপ্ত ধ্বংস হবার পর আর্যাবর্তে একাধিক স্বাধীন রাজ্যের উৎপত্তি হয়। এদের মধ্যে বিশেষ ভাবে উল্লেখ যোগ্য ছিল কনৌজের মৌথরী , থানেশ্বরের পুষ্যভূতি এবং বলভির মৌত্রীক বংশ।

হুন আক্রমণ

খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকে হুনরা চীন সীমান্তে বসবাস করতো। স্কন্দগুপ্ত তাদের প্রতিহত করেন। পঞ্চম শতকে তোরমান এর নেতৃত্বে তারা পুনরায় ভারত আক্রমণ করেন এবং গুপ্ত সম্রাট ভানুগুপ্তের হাতে পরাজিত হয়ে সিন্ধু নদীর অপর তীরে চলে যায়। তোরমানের পুত্র মিহিরকুল ছিল শক্তিশালী ও নিষ্ঠুর , তাঁর রাজধানী ছিল শাকল বা শিয়ালকোট । ঘোরতর বৌদ্ধ বিদ্বেষী মিহিরকুল বহু বৌদ্ধ মঠ এবং মন্দির ধংশ করেন। পশ্চিম মালবের মন্দাঘোরের অধিপতি যশোধর্মন এর 'মান্দাশোর লিপি'থেকে জানাযায় তিনি মধ্যে ভারত থেকে মিহিরকুলকে বিতাড়িত করেন। হিউয়েন সাঙ বলেন, গুপ্ত সম্রাট নরসিংহগুপ্ত বালাদিত্য মিহিরকুলকে চূড়ান্ত ভাবে পরাজিত করে (৫৩৩ খ্রিস্টাব্দে)। মিহিরকুলের পর যোগ্য নেতার অভাবে হুনরা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ভারতীয় বৈবাহিক সম্পর্কে স্থাপিত হয়। তাদের একটি শাখা রাজপুত নামে পরিচিত।

শশাঙ্কের নেতৃত্বে গৌড়ের উত্থান

গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতনের পর বাংলাতে একাধিক স্বাধীন রাজ্যের উৎপত্তি ঘটে এদের মধ্যে গৌড় রাজ্য সর্বাধিক খ্যাতি ও প্রভাব অর্জন করে। এর মূলে ছিল গৌড়াধীপতি শশাঙ্কের বলিষ্ঠ নেতৃত্ব। বাঙালী রাজগণের মধ্যে শশাঙ্কই প্রথম সর্বভৌম নরপতি। তাঁর রাজধানী ছিল " কর্ণসুবর্ণ " ( মুর্শিদাবাদ জেলার বহরমপুর )। তিনি দক্ষিণে দণ্ডভুক্তি ( মেদিনীপুরের দাঁতন ), উৎকল জয় করেন। বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যা জয় করার পরে গৌড়ের শত্রু কনৌজের মৌথরি বংশীয় রাজা গ্রহবর্মনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ যাত্রা করেন। গ্রহবর্মন থানেশ্বরের পুষ্যভূতি বংশীয় রাজা প্রভাকর বর্মনের কন্যা রাজশ্রী কে বিবাহ করেন। মৌথরি ও পুষ্যভূতি বংশের এই বৈবাহিক সম্পর্ক মালবরাজ দেবগুপ্তের পক্ষে অস্বস্তিকর ছিলো। কারণ পুষ্যভূতিদের সঙ্গে মালবের বংশানুক্রমিক শত্রুতা ছিল। এই কারণে দেবগুপ্ত শশাঙ্কের সঙ্গে যৌথ ভাবে কৌনজ আক্রমণ করে। গ্রহবর্মন পরাজিত হয় ( ৬০৬ খ্রিস্টাব্দ) এবং রাজশ্রীকে কারারুদ্ধ করা হয়। থানেশ্বর রাজ প্রভাকর বর্মনের মৃত্যুর পর তরুণ নৃপতি রাজ্যবর্মন তখন দেবগুপ্তের বিরুদ্ধে যুদ্ধ যাত্রা করে এবং দেবগুপ্ত পরাজিত ও নিহত হয়, কিন্তু শশাঙ্ক রাজ্যবর্মনকে হত্যা করে। বাণভট্ট এবং হিউয়েন সাঙ বলেন যে শশাঙ্ক বিশ্বাসঘাতকতা করে। রাজ্যবর্মনের মৃত্যুর পর তার কনিষ্ঠ ভ্রাতা হর্ষবর্ধন থানেশ্বরের সিংহাসনে বসেন (৬০৬ খ্রিস্টাব্দ)। শশাঙ্কের শক্তিবৃদ্ধিতে কামরূপ রাজ ভাস্করবর্মন ভীত হয়ে হর্ষের সঙ্গে যুক্ত হয়ে শশাঙ্কের বিরুদ্ধে যুদ্ধ যাত্রা করে, কিন্তু মিলিত শক্তিজোট শশাঙ্কের কোনো ক্ষতি করতে পারেনি। ৬৩৭ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যু পর্যন্ত তিনি গৌড়, মগধ, উৎকল ও কঙ্গোদ এর অধিপতি ছিলেন।

হর্ষবর্ধন ( ৬০৬-৬৪৭ খ্রিস্টাব্দ )

শশাঙ্কের হাতে জোষ্ঠভ্রাতা রাজ্যবর্মনের মৃত্যুর পর মাত্র ষোল বছর বয়সে হর্ষবর্ধন থানেশ্বরের পূষ্যভূতি বংশের সিংহাসনে বসেন (৬০৬ খ্রিস্টাব্দ)। গ্রহবর্মার মৃত্যুতে কৌনজের শাসনভারও তিনি গ্রহণ করেন। যুগ্ম রাজ্যের রাজধানী নির্বাচিত হয় কৌনজ। নিজের সিংহাসন আরোহন স্মরণীয় করে রাখার জন্য ৬০৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে নুতুন বর্ষ গণনা বা অব্দের প্রচলন করেন তার নাম হয় " হর্ষাব্দ " বা ' হর্ষ সম্বৎ '। শশাঙ্কের মৃত্যুর পর তিনি মগধ, উড়িষ্যা, কঙ্গোদ ও পশ্চিমবঙ্গ জয় করেন এবং সমগ্র আর্যাবর্তে নিজ অধিপত্য প্রভুত্ব স্থাপন করেন। দাক্ষিণাত্য অভিযান পাঠায় কিন্তু চালুক্য বংশীয় রাজা দ্বিতীয় পুলকেশীর কাছে পরাজিত হয়ে ফিরে আসেন। বাতাপীর চালুক্য রাজ দ্বিতীয় পুলকেশীর একটি শিলালিপিতে হর্ষকে " সকলোত্তর পথনামা " বা সকল উত্তর পথের অধিশ্বর বলা হয়েছে। তাঁর রচিত নাগানন্দ, রত্নাবলী ও প্রিয়দর্শিতা নাটক সংস্কৃত সাহিত্যর মূল্যবান সম্পদ। তিনি সাহিত্য সেবীদের জন্যে রাজস্বের এক-চতুর্থাংশ ব্যায় করতেন। কাদম্বরী ও হর্ষচরিত রচয়িতা বাণভট্ট তার সভাকবি ছিলেন। এছাড়াও জয়সেন, ময়ূর মাতঙ্গ, দিবাকর , কবি মৌর্য ও কবি ভৃগহরি তাঁর সভা অলংকৃত করেন। তিনি বৌদ্ধ মঠে মুক্ত হস্তে দান করলেও তিনি বৌদ্ধ ছিলেন না ছিলেন শিব ও সূর্যের উপাসক। অশোক ও আকবরকে বাদ দিলে হর্ষবর্ধন ছিলেন ভারতের শ্রেষ্ঠ প্রজাহিতৈষী নরপতি। তাঁর উপাধী ছিল " শিলাদিত্য "।

হিউয়েন সাঙ এর বিবরণ

হর্ষবর্ধনের রাজত্ব কালে বিখ্যাত চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ ভারতে আসেন। দীর্ঘ চোদ্দ বছর ( ৬৩০-৬৪৪ খ্রিস্টাব্দ ) ভারতের নানা স্থানে তিনি ভ্রমণ করে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। চীনা ভাষায় রচিত তার ভ্ৰমণ-বৃত্তান্তটির নাম হল " সি-ইউ-কী "।

Thanks for your comment. We review and answer your comment.

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post