মগধের উত্থান

খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে অর্থাৎ মহাবীর ও বুদ্ধদেবের ধৰ্ম প্রচার কালে উত্তর ভারতে বা আর্যাবর্তে কোনো ঐক্যবদ্ধ শক্তি গড়ে ওঠেনি। উত্তর ভারতে এই সময় ষোড়শ মহাজন পদ বা ষোলটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্রে বিভক্ত ছিল। বৌদ্ধ জাতক , অঙ্কুওর নিকার , জৈন ভগবতী সূত্র এবং হিন্দু পুরান থেকে এই সব রাজ্যে গুলির কথা জানা যায়। এই রাজ্যে গুলি হলো : ( ১ ) অঙ্গ ( পূর্ব বিহার ), ( ২ ) মগধ ( দক্ষিণ বিহার ), ( ৩ ) কাশী ( বারাণসী ), ( ৪ ) কোশল ( অযোধ্যা ), ( ৫ ) বৃজি ( উত্তর বিহার ), ( ৬ ) মল্ল ( গোরক্ষপুর ), ( ৭ ) চেদি ( বুন্দেলখন্ড ), ( ৮ ) বৎস ( এলাহাবাদ ), ( ৯ ) কুরু ( দিল্লি ), ( ১০ ) পাঞ্চাল ( বেরিলি-বদায়ুন অঞ্চল ), ( ১১ ) মৎস্য ( জয়পুর ), ( ১২ ) শূরসেন ( মথুরা ), ( ১৩ ) অস্মক ( গোদাবরী উপত্যকা ), ( ১৪ ) গান্ধার ( পেসোয়ার-রাওয়ালপিন্ডি , ( ১৫ ) কম্বোজ ( পশ্চিম কাশ্মীর ) এবং ( ১৬ ) অবন্তী ( মালব ) . এই রাজ্যগুলি অধিকাংশই রাজতন্ত্র-শাসিত হলেও বৃজি ও মল্ল রাজ্যে প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত ছিল। এই রাজ্যগুলির মধ্যে অবন্তী , বৎস , কোশল মগধ খুবই শক্তিশালী ছিল।

মগধের উত্থান

হর্ষঙ্ক বংশ :

বিম্বিসার : বুদ্ধদেবের সমসাময়িক বিম্বিসার ৫৪৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মগধের সিংহাসনে বসেন। তাঁর উপাধি ছিলি শ্রেনীক। তিনি অঙ্গ রাজ ব্রম্ভদত্তকে পরাজিত করে অঙ্গ রাজ্যটি দখল করেন। অঙ্গ রাজ্যের চম্পা বন্দরটি মগধের বাণিজ্য সম্প্রসারণে সাহায্য করে। তিনি কোশল রাজ প্রসেনজিতের ভগিনী কোশলদেবীকে বিবাহ করে যৌতুক হিসাবে কাশী গ্রাম লাভ করেন। এছাড়াও তিনি বৈশালীর লিচ্ছবি রাজকন্যা চেল্লনা , বিবেদ রাজকন্যা বাসবী ও মদ্র রাজকন্যা খেমা কে বিবাহ করে তাঁর রাজশক্তি বৃদ্ধি করেন। তিনি তাঁর রাজধানী গিরিব্রজ থেকে রাজগৃহে স্থানান্তরিত করেন।

অজাতশত্রু : বিম্বিসারের পুত্র আজতশত্রু ৪৯৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দে সিংহাসনে বসেন। তাঁর উপাধি ছিল কুনিক। কথিত আছে যে তিনি পিতা বিম্বিসারকে হত্যা করে সিংহাসনে বসেন। এর জন্য কোশল রাজ প্রসেনজিত যৌতুক হিসাবে প্রদত্ত কাশি গ্রাম পুনর্দখল করেন। আজতশত্রু এবং প্রসেনজিতের মধ্যে যুদ্ধ বাধে , শেষপর্যুন্ত প্রসেনজিতের কন্যা ভোজীরা কুমারীকে অজাতশত্রু বিয়ে করতে রাজী হয়। বৈশালীর লিচ্ছবিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ জয় তাঁর অন্যতম কীর্তি। দীর্ঘ ১৬ বৎসর যুদ্ধের পর বৈশালী রাজ্য দখলে আসে। তিনি কোশল রাজ্যে জয় করে সমগ্র পূর্ব ভারতে মগধের অধিপত্য স্থাপন করে।

উদয়ী , অনুরুদ্ধ , মুণ্ড , নাগদশক : আজতশুত্রুর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র উদয়ী বা উদয়ীভদ্র ৪৫৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দে সিংহাসনে বসেন। গঙ্গা এবং শোন নদীর সংযোগস্তলে পাটলিপুত্র নামক স্থানে তিনি রাজধানী স্থানান্তরিত করেন। তাঁর সময় অবন্তীর সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ চলছিল। উদয়ীর পর অনুরুদ্ধ , মুণ্ড ও নাগদশক নামে তিন জন দুর্বল রাজা সিংহাসনে বসেন। বৌদ্ধ গ্রন্থে এঁদের তিনজনকেই পিতৃহত্যা বলা হয়েছে।

শিশুনাগ বংশ :

শিশুনাগ ও কালশোক : ৪৩০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে হর্ষঙ্ক বংশের শেষরাজা নাগদশকে হত্যা করে তাঁর সভাসদ শিশুনাগ মগধের সিংহাসনে বসেন। তিনি গিরিব্রজ থেকে রাজগৃহে রাজধানী স্থানান্তরিত করেন। তিনি অবন্তী রাজ্যে জয় করে মগধের শক্তি ও আয়তন বৃদ্ধি করেন। তিনি বৎস রাজ্যও জয় করেন। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র কালশোক বা কাকবর্ণ সিংহাসনে বসেন। তিনি পাটলিপুত্রে রাজধানী স্থানান্তরিত করেন।

নন্দ বংশ :

মহাপদ্ম নন্দ: শিশুনাগ বংশের শেষ রাজা কাকবর্ণকে হত্যা করে মহাপদ্ম নন্দ বিখ্যাত নন্দ বংশের প্রতিষ্ঠা করেন। পূরণ , বৌদ্ধ এবং জৈন শাস্ত্রগ্রন্থে তাঁকে নীচ বংশ - সম্ভূত বা শুদ্র বলা হয়েছে। তিনি পাঞ্চাল , কাশী , অস্মক , কলিঙ্গ , কুরু , শূরসেন , মিথিলা জয় করে সমগ্র উত্তর ভারতে মগধের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। মহাপদ্মের আগে কোনো ভারতীয় নরপতি এতোবড়ো সাম্রাজ্যের অধিশ্বর হতে পারেনি। পুরানে তাঁকে 'সর্বক্ষত্রান্তক' বা সকল ক্ষত্রিয় রাজার উচ্ছেদকারী বা 'সর্বক্ষত্রিয়চ্ছেদা' এবং ' দ্বিতীয় পরশুরাম ' বলা হয়েছে।

মহাপদ্ম নন্দের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র ধননন্দ সিংহাসনে বসেন। তিনি কর হার বৃদ্ধি করে এক সু-বিশাল সেনা দল তৈরী করেন। তাঁর সামরিক বলের ভয়েই গ্রীক বীর আলেকজান্ডার মগধের উপর আক্রমণ হানতে সাহস পায়নি। ধননন্দ জনসাধারণের উপর প্রভূত করভার চাপিয়ে ঘৃণার পাত্রে পরিণতি হয়। এমনাবস্থায় কৌটিল্য নামক জৈনিক কূটনীতিজ্ঞ ব্রাম্ভনের সহায়তায় চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্য ধননন্দকে পরাজিত করে মগধের সিংহাসনে মৌর্য্য বংশ প্রতিষ্ঠিত করে।

Thanks for your comment. We review and answer your comment.

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post