ভারতের মন্দির স্থাপত্য শৈলী সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্যাবলী

ভারতের মন্দির স্থাপত্য শৈলী সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্যাবলী

গুপ্তযুগে একটি স্তম্ভযুক্ত বারান্দা এবং বর্গাকার গর্ভগৃহের সহিত মন্দির স্থাপত্য শিল্পের বিকাশ লাভ ঘটেছিল । এই যুগের প্রথম পর্যায়ে মন্দিরগুলি একশিলা ও সমতল ছাদ বিশিষ্ট এবং ক্রমান্বয়ে তা ' শিখর ' - এ রূপান্তরিত হয় । মন্দিরের এই অগ্রগতিকে পাঁচট পর্যায়ে ভাগ করা যেতে পারে । পর্যায় গুলি হলো -

প্রথম পর্যায় :
( ১ ) মন্দিরগুলো সমতল ছাদ বিশিষ্ট ।
( ২ ) মন্দিরগুলি ছিল বর্গাকার ।
( ৩ ) বারান্দাগুলো অগভীর স্তম্ভের উপর নির্মিত ।
( ৪ ) সমগ্র কাঠামোটি নিম্ন প্লাটফর্মের উপর নির্মিত ।
উদাহরণ : এই ধরনের মন্দির হল- সাঁচি'র ১৭ নং মন্দির ।

দ্বিতীয় পর্যায় :
( ১ ) সমগ্র কাঠামোটি উচ্চতর বা উন্নীত প্ল্যাটফর্মের উপর নির্মিত ।
( ২ ) অধিকাংশ মন্দিরগুলো দ্বিতল বিশিষ্ট ।
( ৩ ) আচ্ছাদিত গর্ভগৃহের চারপাশে চলাচলের পথ রয়েছে ।
( 8 ) প্রদক্ষিণ পথ হিসাবে গিরিপথ ব্যবহার করা হত ।
উদাহরণ : মধ্যপ্রদেশের নাচনা কুঠারাতে অবস্থিত পার্বতী মন্দির ।

তৃতীয় পর্যায় :
( ১ ) মন্দিরগুলোতে সমতল ছাদের পরিবর্তে শিখর লক্ষ্য করা যায় ।
( ২ ) পঞ্চায়তন শৈলী লক্ষ্য করা যায় ।
( ৩ ) মূল মন্দিরের দু'পাশে সহকারী মন্দির স্থাপন করা হয় , যা কুশবিদ্ধ আকৃতি নেয় ।
উদাহরণ : দশাবতার মন্দির ( দেওগড় , উত্তরপ্রদেশ ) , দুর্গামন্দির ( আইহোল , কর্ণাটক ) ।

চতুর্থ পর্যায় :
এই পর্যায়ের মন্দিরগুলো প্রায় একইরকম ছিল , তবে মূল মন্দিরটি আরও বেশি আয়তাকার হয়ে ওঠে ।
উদাহরণ : তের মন্দির ( শোলাপুর ) ।

পঞ্চম পর্যায় :
( ১ ) মন্দিরগুলো বৃত্তাকার বিশিষ্ট হয় তবে সঙ্গে অগভীর আয়তক্ষেত্রাকার অভিক্ষেপ লক্ষ্য করা যায় ।
( ২ ) অন্যান্য বৈশিষ্টগুলো পূর্বের মতোই ।
উদাহরণ : মনিয়ার মঠ ( রাজগীর ) ।

মন্দির স্থাপত্যের বিবিধ শৈলী :-

ভারতের যে যে ধরনের মন্দির স্থাপত্য শৈলী লক্ষ্য করা যায় । সেগুলি হল-
( ১ ) নাগারা শৈলী
( ২ ) দ্রাবিড় শৈলী
( ৩ ) ভেসারা শৈলী
( ৪ ) হোয়সালা শৈলী
( ৫ ) বিজয়নগর শিল্প শৈলী
( ৬ ) নায়কা শৈলী
( ৭ ) পাল এবং সেন স্কুল শৈলী ।

হিন্দু মন্দিরের মৌলিক রূপটি যে যে বিষয় নিয়ে গঠিত হয় সেগুলি হল -
( ১ ) গর্ভগৃহ : এটি একটি বর্গাকার ছোট ঘর যেখানে মন্দিরের প্রধান দেবতা বিরাজ করেন ।
( ২ ) মণ্ডপ : এটি মন্দিরের প্রবেশদ্বার । এটি সাধারণত উপাসকদের বসার কিংবা উপাসনার জন্য তৈরি করা হয় ।
( ৩ ) শিখর : এটি একটি চূড়ার মতো । কখনো কখনো এর আকার পিরামিডের মতো হয়ে থাকে ।
( ৪ ) বাহন : এটি মন্দিরের প্রধান দেবতার বাহন যেটি গর্ভগৃহের ঠিক সামনে প্রতিস্থাপন করা হয় ।

নাগারা শৈলী :-

খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতাব্দী থেকে উত্তর ভারতে যে স্বতন্ত্র মন্দির শৈলীর বিকাশ লাভ ঘটেছিল তাকে নাগারা স্থাপত্য শৈলী বলে । নাগারা শৈলীর বেশ কিছু বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায় । সেগুলি হলো -
মন্দিরগুলো সাধারণত পঞ্চায়তন শৈলীতে তৈরি ।
মূল মন্দিরের সামনে প্রধান উপাসনা হল লক্ষ্য করা যায় ।
গর্ভগৃহের বাইরে নদী দেবীর ছবি স্থাপন করা হয়ে থাকে ।
মন্দির চত্বরে কোনো জলাধার থাকে না ।
মন্দিরগুলো সাধারণত উঁচু প্ল্যাটফর্মের উপর নির্মিত হয়েছিল ।
বারান্দাগুলো স্তম্ভযুক্ত হয় ।
মন্দিরগুলোতে শিখর লক্ষ্য করা যায় । শিখরগুলো সাধারণত তিন ধরনের হয় -
( ১ ) ল্যাটিন বা রেখা প্রসাদ : এর ভিত গোলাকার এবং দেওয়াল উপরের দিকে বিন্দুতে মিলিত হয়েছে ।
( ২ ) ফামসানা : বিস্তৃত ভিত ছিল । উপরের দিকে ঢালু সরল রেখা বরাবর বিস্তৃত ।
( ৩ ) ভালভী : ছাদের সহিত একটি আয়তাকার ভিত ছিল এবং যেটি খিলানযুক্ত ।
শিখরের উলম্ব প্রাপ্তটি একটি অনুভূমিক রাশিতে শেষ হয়েছিল যা ' আমলক ' নামে পরিচিত । তার উপরে গোলাকার আকৃতিবিশিষ্ট জিনিস থাকে যেটি ' কলস ' নামে পরিচিত ।
মন্দিরের অভ্যন্তরের প্রাচীরটি তিনটি উলম্বভাবে বিভক্ত যা ' রথ ' নামে পরিচিত । যেমন- ত্রিরথ মন্দির ।
গর্ভগৃহ বেষ্টন করে চারিদিকে প্রদক্ষিণ পথ রয়েছে । নাগারা শৈলীতে নির্মিত তিনটি উপ - বিদ্যালয় হল – ( ১ ) ওড়িশা স্কুল ( ২ ) খাজুরাহো স্কুল ( ৩ ) সোলাঙ্কি স্কুল ।

দ্রাবিড় মন্দির শৈলী :–

চোল শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায় দক্ষিণ ভারতে শত শত মন্দিয় তৈরি হয়েছিল । এটি পূর্ববর্তী পল্লব স্থাপত্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখলে কিছু কিছু ক্ষেত্রে বৈচিত্র্য লক্ষ্য করা যায় । এই বৈচিত্র্যই দ্রাবিড় মন্দির শৈলীর পরিচায়ক । দ্রাবিড় মন্দির শৈলীর কয়েকটি বৈশিষ্ট্য হল -
মন্দিরগুলো উঁচু সীমানা প্রাচীর দ্বারা ঘেরা ।
সামনের দেওয়ালে একটি সুউচ্চ প্রবেশদ্বার আছে যা ' গোপুরম ' নামে পরিচিত ।
মন্দির চত্বরটি একটি প্রধান মন্দির এবং চারটি সহায়ক মন্দির - সহ পঞ্চায়তন শৈলীতে সজ্জিত ।
মন্দিরের চূড়াটি পিরামিডের ধাপের আকারে রয়েছে যেটি বাঁক না হয়ে রৈখিকভাবে উপরে উঠে । এটি ' বিমানা ' নামে পরিচিত ।
মুকুটটি অষ্টভূজাকার আকৃতির হয় যা শিখর নামে পরিচিত ।
' বিমানা ' কেবলমাত্র মূল মন্দিরে লক্ষ্য করা যায় , সহকারী মন্দিরগুলোতে থাকে না ।
সভাকক্ষ হল গর্ভগৃহের সাথে সংযুক্ত থাকে । ভেস্টিবুলার টানেল দ্বারা যেটি ' অন্তরালা ' নামে পরিচিত ।
আবদ্ধ মন্দির চত্বরে একটি জলাধার লক্ষ্য করা যায় ।
উদাহরণ : বৃহদেশ্বর মন্দির ( তাঞ্জোর ) , গঙ্গাইকোওচোলাপুরম প্রভৃতি ।

ভেসারা শৈলী :-

ভেসারা হল ভারতীয় হিন্দু মন্দিরের একটি স্বতন্ত্র ঐতিহ্যবাহী শৈলী । এই শৈলীটি উত্তর ভারতের কিছু অংশ , দাক্ষিণাত্য এবং এ মধ্যভারতে অনুসৃত হয় । মূলত , চালুক্য রাজবংশ , রাষ্ট্রকূট এবং হোসালা রাজবংশের নরপতিগণ এই শৈলী ব্যবহার করে মন্দির তৈরি করতেন । এই মন্দির শৈলীর কয়েকটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল -
এটি সাধারণত নাগারা এবং দ্রাবিড়িয়ান শৈলীর মিলিত শৈলী ।
এটিতে বিমানা এবং মণ্ডপের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে ।
উন্মুক্ত ভ্রাম্যমান পথ পরিলক্ষিত হয় ।
স্তম্ভ , দরজা এবং ছাদগুলি দুর্বোধ্য খোদাই করা নকশা খচিত ।
উদাহরণ : দোদাবাসাপ্পা মন্দির ( দাম্বাল ) , লাদাখান মন্দির ( আইহোল ) ।

হোয়সালা শৈলী :–

হোয়সালা স্থাপত্য হল হিন্দু মন্দির স্থাপত্য শৈলী যা একাদশ থেকে চতুর্দশ শতকে হোয়সালা রাজবংশের আমলে বিকাশ লাভ ঘটেছিল । এই মন্দির শৈলীর বিশেষ বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল -
অধিকাংশ মন্দিরগুলো ছিল শিবা বা বিষ্ণুর । তবে মাঝে মাঝে জৈন ধর্মের প্রতি নিবেদিত প্রাণ ও লক্ষ্য করা যায় ।
কেন্দ্রীয় স্তভযুক্ত হলের চারপাশে একাধিক মাজার / ছোট মন্দির ঘর লক্ষ্য করা যায় ।
মন্দিরগুলোর বেশিরভাগই ভাস্কর্যে চিত্রিত যার মধ্যে ধর্মনিরপেক্ষতার বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায় ।
চোরাইট শিষ্ট ছিল প্রধান ভবন তৈরির মূল সরঞ্জাম ।
উদাহরণ : চেন্নাকেশব মন্দির ( বেলুর ) , হোয়সালেশ্বর মন্দির ( হালেবিন্দু ) ।

বিজয়নগর শিল্পশৈলী :-

বিজয়নগর সাম্রাজ্যের শাসকরা শিল্প ও স্থাপত্যের মহান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন । তাঁরা চোল , হোয়সালা , গান্ডব ও চালুক্যদের স্থাপত্যশৈলীর সংমিশ্রিত রূপ স্ব স্ব শিল্প স্থাপত্যের প্রয়োগ করেছিলেন । তাঁদের স্থাপত্য শৈলী বিজাপুরের ইন্দো - ইসলামিক শৈলীর দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল । এই শিল্পশৈলীর উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল -
মন্দিরগুলির দেওয়ালগুলো খোদাই করা কারুশিল্প ও জ্যামিতিক চিত্রের দ্বারা সজ্জিত ছিল ।
' গোপুরম ' মন্দিরের সবদিকের দেওয়ালে লক্ষ্য করা যায় ।
একশিলা বিশিষ্ট পাথরের স্তম্ভ লক্ষ্য করা যায় ।
মন্দিরের স্তম্ভগুলিতে একটি পৌরাণিক প্রাণী ( বিশেষত ঘোড়া ) খোদাই করা থাকে ।
মন্দির ঘেরা দেওয়ালগুলো ছিল বেশ বড় ।
প্রতিটি মন্দিরে একাধিক মণ্ডপ তৈরি করা হয় । কেন্দ্রীয় মণ্ডপটি ' কল্যাণ ' নামে পরিচিত ।
মন্দির কক্ষের ভিতরে ধর্মনিরপেক্ষ ভবনের ধারণা প্রচলিত ছিল ।
সমগ্র মন্দির চত্তরটি সীমানা দ্বারা বেষ্টিত ।
উদাহরণ : বিঠলস্বামী মন্দির , লোটাস মহল , বিরূপাক্ষ মন্দির ( হাম্পি ) , রঘুনাথ মন্দির ( হাম্পি ) ।

নায়কা শৈলী :-

ষোড়শ ও অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে নায়কা স্কুল অফ আর্কিটেকচারের বিকাশলাভ ঘটে । এটি ' মাদুরাই স্কুল ' স্থাপত্য নামেও অধিক পরিচিত । এর কয়েকটি বৈশিষ্ট্য হল -
এটি স্থাপত্য শৈলীর দিক থেকে দ্রাবিড় শৈলীর অনুরূপ হলেও কিন্তু আয়তনে তার থেকে বৃহৎ ।
বারান্দার মধ্যে বিশাল করিডোর বা ' প্রকর্ম ' উপস্থিত এবং গর্ভগৃহের চারপাশে ছাদসহ ভ্রমণের উদ্দেশ্যে পথ রয়েছে ।
নায়কা শাসকদের অধীনে নির্মিত ' গোপুরম ' ছিল বৃহত্তম ' গোপুরম ' । প্রসঙ্গত মীনাক্ষী মন্দিরের গোপুরম বিশ্বের সর্বোচ্চ ' গোপুরম ' ।
মন্দিরে গাত্র ছিল দুর্বোধ্য চিত্রতে পরিপূর্ণ ।
উদাহরণ : মীনাক্ষী মন্দির ( মাদুরাই ) ।

পাল ও সেন স্কুল শৈলী :–

বাংলা অঞ্চলে অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মাঝে যে স্থাপত্য শৈলীর বিকাশ লাভ ঘটেছিল তা পাল ও সেন স্কুল স্থাপত্য শৈলী নামে পরিচিত । পাল রাজারা অসংখ্য বিহার , চৈত্য এবং স্তূপ নির্মাণ করেছিলেন । সেন রাজারা অসংখ্য হিন্দু মন্দির , বৌদ্ধ স্তুপ নির্মাণ করেছেন । এই সময়ের স্থাপত্য শৈলীর বৈশিষ্ট্যগুলো হল -
ভবনগুলির ছাদগুলো বক্র বা ঢালু যা দেখতে বাঁশের তৈরি কুঁড়েঘরের মতো ।
ভবনগুলি তৈরির মুখ্য উপাদান হল পোড়া ইট বা টেরাকোটা ইঁট ।
মন্দিরগুলির লম্বা ও বাঁকা শিখর রয়েছে ।
মন্দিরগুলো উজ্জ্বল্য সুন্দর ও চাকচিক্যময় ।
উদাহরণ : নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় , ওদন্তপুরি ও বিক্রমশিলা মহাবিহার , সিদ্ধেশ্বর মহাদেবমন্দির ( বরাকর ) প্রভৃতি ।

Thanks for your comment. We review and answer your comment.

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post