ভিটামিন বা খাদ্যপ্রাণ উৎস , কাজ ও অভাবজনিত লক্ষণ

ভিটামিন বা খাদ্যপ্রাণ  উৎস , কাজ ও অভাবজনিত লক্ষণ

ভিটামিন বা খাদ্যপ্রাণ (Vitamin) :

বিজ্ঞানী লুনিন ( Lunin , 1881 ) প্রথম লক্ষ করেন যে , প্রয়োজনীয় সবরকম খাদ্য গ্রহণ করা সত্ত্বেও বিশেষ এক খাদ্য উপাদানের অভাবে জীবদেহের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও পুষ্টি হয় না । বিজ্ঞানী হপকিনস্ ( Hopkins ) ওই প্রকার খাদ্যোপাদানকে ' অত্যাবশ্যক সহায়ক খাদ্যোপাদান ' রূপে অভিহিত করেন । 1912 খ্রিস্টাব্দে বিজ্ঞানী কাশিমির ফাঙ্ক ( Casimir Funk ) এই পদার্থকে ভাইটামাইন ( vitamine ) নামে অভিহিত করেন ।

সংজ্ঞা : যে বিশেষ খাদ্যোপাদান স্বাভাবিক খাদ্যে অল্প পরিমাণে থেকে দেহের স্বাভাবিক পুষ্টি ও বৃদ্ধিতে সাহায্য করে এবং দেহের রোগ - প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং যার অভাবে দেহে বিভিন্ন রোগলক্ষণ প্রকাশ পায় , তাকে ভিটামিন বা খাদ্যপ্রাণ বলে ।

ভিটামিনের বৈশিষ্ট্য ( Characteristics of Vitamin ) :

ভিটামিনের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি হল —

( i ) ভিটামিন একপ্রকারের জৈব অনুঘটক , যা বিপাক ক্রিয়ায় কো - এনজাইমরূপে কাজ করে ।
( ii ) ভিটামিন সাধারণ খাদ্যে খুব কম পরিমাণে থাকে ।
( iii ) ভিটামিন অন্যান্য খাদ্যোপাদানের তুলনায় জীবদেহে খুব কম পরিমাণে প্রয়োজন হয় ।
( iv ) ভিটামিন পরিপাক ক্রিয়ায় নষ্ট হয় না ।
( v ) উচ্চ তাপমাত্রায় , জারণ ক্রিয়ায় , রন্ধনকালে , তীব্র সূর্যালোকে এবং ক্ষারীয় পরিবেশে কোনো কোনো ভিটামিন নষ্ট হয়ে যায় বা তাদের কার্যকারিতা হ্রাস পায় ।
( vi ) দ্রাব্যতা অনুসারে ভিটামিন দু - প্রকারের , যথা — জলে দ্রাব্য ( B - complex , C ) এবং স্নেহপদার্থে দ্রাব্য ( A , D , E , K ) ।

প্রোভিটামিন : যেসব জৈব যৌগ থেকে প্রাণীদেহে ভিটামিন উৎপন্ন হয় তাদের প্রোভিটামিন বলে । যেমন — বিটা ক্যারোটিন ভিটামিন A-র এবং আর্গোস্টেরল ভিটামিন D-র প্রোভিটামিন ।
সিউডোভিটামিন : যেসব জৈব যৌগ ভিটামিনের গঠন সদৃশ , কিন্তু ভিটানিনের গুণসম্পন্ন নয় তাদের সিউডোভিটামিন বলে । যেমন- মিথাইল কোবালামিন ভিটামিন B12 এর সিউডোভিটামিন ।
অ্যান্টিভিটামিন : রাসায়নিক গঠনে সাদৃশ্য থাকা সত্ত্বেও যেসব যৌগ ভিটামিনের ক্রিয়া বিনষ্ট করে বা ভিটামিনের ক্রিয়ায় বাধা দেয় তাদের অ্যান্টিভিটামিন বলে । যেমন — পাইরিখায়ামিন থায়ামিনের ক্রিয়া বিনষ্ট করে , গ্যালাকটোফ্ল্যাভিন রাইবোফ্ল্যাভিনের ক্রিয়া বিনষ্ট করে ।

মানবদেহে ভিটামিনের ভূমিকা , উৎস ও অভাবজনিত লক্ষণ ( Role of vitamin in human body, Source and Symptoms of deficiency ) :

ভিটামিন A

রাসায়নিক নাম : রেটিনল বা অ্যাজেরপথল

উৎস :
উদ্ভিদজ : উদ্ভিদজাত উৎস হল হলুদ ও সবুজ শাকসবজি, রঙিন ফলমূল, সাধারণত যে শাকসবজি বা ফলের রঙ যত গাঢ় হয় তাতে ভিটামিন ‘এ’ র পরিমান তত বেশি হয়। এছাড়া গাজর, কুমড়ো, পাকা পেঁপে, ঘি, মাখন ও অন্যান্য সব্জি, ফল ইত্যাদিতে ভিটামিন ‘এ’ থাকে।
প্রাণীজ : প্রাণীজাত উৎস হল মূলত মাংসাশী প্রাণী ( হাঙর, কড, হ্যলিবাট ইত্যাদি মাছের যকৃৎ )। মাছের তেল বা তেলযুক্ত মাছ। মাংস, ডিম ইত্যাদি খাবার থেকে ভিটামিন ‘এ’ পাওয়া যায়।

এই ভিটামিন B-ক্যারোটিন থেকে মানবদেহে সংশ্লেষিত হয় ।

মানবদেহে এই ভিটামিনের ভূমিকাগুলি হল –
( i ) দেহের সামগ্রিক বৃদ্ধিতে সহায়তা করে ।
( ii ) রেটিনার রড কোশ গঠনে সাহায্য করে ।
( iii ) ত্বকের স্বাভাবিকতা বজায় রাখে ।
( iv ) রোগ সংক্রমণ প্রতিরোধ করে ।

অভাবজনিত লক্ষণ : এই ভিটামিনের অভাবে রাতকানা , অন্ধত্ব এবং ফিনোডার্ম বা Toad's skin রোগটি হয় ।

ভিটামিন D

রাসায়নিক নাম : ক্যালসিফেরল , ভিটামিন D3 ( কোলেক্যালসিফেরল ) , ভিটামিন D5 ( সিটোক্যালসিফেরল ) ।

উৎস : ভিটামিন ডি এর প্রধান প্রাকৃতিক উৎস হলো সূর্যের আলো। সূর্যালোকের উপস্থিতিতে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে ত্বকের এপিডার্মিসের নীচের স্তরে কলিক্যালসিফেরলের সংশ্লেষণের মাধ্যমে ভিটামিন D তৈরি হয় (বিশেষত অতিবেগুনী রশ্মির বিকিরণ)।

মানবদেহে এই ভিটামিনের ভূমিকাগুলি হল –
( i ) অস্থি ও দন্ত গঠনে সহায়তা করে ।
( ii ) অস্ত্রে Ca ও P শোষণে সহায়তা করে ।
( iii ) অস্থি ও রক্তে Ca- এর সাম্যতা বজায় রাখে ।

অভাবজনিত লক্ষণ : এই ভিটামিনের অভাবে ছোটোদের রিকেট এবং বড়োদের অস্টিওম্যালেশিয়া রোগ হয় ।

ভিটামিন E

রাসায়নিক নাম : টোকোফেরল

উৎস :
উদ্ভিদজ : উদ্ভিদজাত উৎস হল বাদাম , কাজু , ভুট্টা , চীনাবাদাম , গমের তেল , কাঁচা শাক সবজি , ভাত , আলু ।
প্রাণীজ : প্রাণীজাত উৎস হল মাছ , মাখন , পনির , ডিম , দুধ , মাংস ।

মানবদেহে এই ভিটামিনের ভূমিকাগুলি হল –
( i ) এই ভিটামিন মানবদেহের বন্ধ্যাত্ব প্রতিরোধ করে ।
( ii ) মাতৃস্তনে দুগ্ধ ক্ষরণ বৃদ্ধি করে ।
( iii ) ভ্রূণের বৃদ্ধিতে সহায়তা করে ও গর্ভপাত প্রতিরোধ করে ।

অভাবজনিত লক্ষণ : এই ভিটামিনের অভাবে মায়ের দুগ্ধ ক্ষরণ হ্রাস পায় এবং বন্ধ্যাত্ব রোগলক্ষণ প্রকাশ পায় ।

ভিটামিন K

রাসায়নিক নাম : ফাইলোকুইনন বা ন্যাপথোকুইনন

উৎস : পালং শাক , বিট , ফুলকপি , বাঁধাকপি , শতমূলী ইত্যাদি

মানবদেহে এই ভিটামিনের ভূমিকাগুলি হল –
এই ভিটামিন রক্তে প্রোথ্রম্বিনের মাত্রা স্বাভাবিক রাখে এবং রক্ততঞ্জনে সহায়তা করে ।

অভাবজনিত লক্ষণ : এই ভিটামিনের অভাবে রক্তক্ষরণ বন্ধ হয় না ।

ভিটামিন B- কমপ্লেক্স

রাসায়নিক নাম : এই ভিটামিন অনেকগুলি ভিটামিনের সমষ্টি , যেমন— B1 (থায়ামিন) , B2 (রাইবোফ্ল্যাভিন) , B3 (নিয়াসিন) , B5 (পেন্টাথেনিক অ্যাসিড) , B6 (পাইরিডক্সিন) , B7 (বায়োটিন) , B9 (ফলিক অ্যাসিড) , B12 (সায়ানোকোবালামিন)

উৎস :
উদ্ভিদজ : সিম্বগোত্রীয় উদ্ভিদে (মটর, ছোলা , ডাল , মটরশুটি ইত্যাদি) প্রচুর পরিমানে ভিটামিন B- কমপ্লেক্স পাওয়া যায়। এছাড়া আলু, কলা, মরিচ ইত্যাদিতে পাওয়া যায়।
প্রাণীজ : মাংসে সর্বাধিক পরিমাণে ভিটামিন B- কমপ্লেক্স পাওয়া যায়।

মানবদেহে এই ভিটামিনের ভূমিকাগুলি হল –
( i ) এই ভিটামিন মানবদেহে রক্তকোশ গঠন , ক্ষুধা বৃদ্ধি , হজম শক্তি বৃদ্ধি , পেলেগ্রা ও বেরিবেরি প্রতিরোধ করে ।
( ii ) এই ভিটামিন স্নায়ুকোশ সুস্থ রাখে ।

অভাবজনিত লক্ষণ : এই ভিটামিনের অভাবে বেরিবেরি , স্টোমাটাইটিস , রক্তাল্পত্য , পেলেগ্রা প্রভৃতি রোগ হয় । নিয়াসিন পেলেগ্রা প্রতিরোধ করায় একে P - P ফ্যাক্টর বা পেলেগ্রা প্রিভেনটিভ ফ্যাক্টর বলে ।

ভিটামিন C

রাসায়নিক নাম : অ্যাসকরবিক অ্যাসিড

উৎস : লেবু এবং লেবুজাতীয় টক ফল ভিটামিন C উৎস । এছাড়া কমলা, তেঁতুল, আঙুর, পেঁপে, আনারস, জাম ইত্যাদি ফলে রয়েছে প্রচুর পরিমানে ভিটামিন C । সবুজ পাতা গোত্রের সব সবজি ও শাকেও পাওয়া যায় এই ভিটামিন।

মানবদেহে এই ভিটামিনের ভূমিকাগুলি হল –
( i ) মানবদেহে মাড়িকে সুস্থ রাখে ।
( ii ) রক্তক্ষরণ হ্রাস করে ।
( iii ) লোহিতকণিকা ও অণুচক্রিকা গঠন করে ।
( iv ) স্কার্ভি প্রতিরোধ করে ।

অভাবজনিত লক্ষণ : এই ভিটামিনের অভাবে স্কার্ভি রোগ হয় এবং রক্তাল্পতা লক্ষণ প্রকাশ পায় ।

Thanks for your comment. We review and answer your comment.

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post