কেন্দ্রীয় সরকারের রাজকোষ নীতি (ফিস্কাল পলিসি)

কেন্দ্রীয় সরকারের রাজকোষ নীতি

কেন্দ্রীয় সরকারের রাজকোষ নীতি হল এমন এক প্রকারের নীতি যেখানে কর ধার্য করে রাজস্ব আদায় করা হয় এবং আর্থ - সামাজিক উন্নয়নে বিনিয়োগ করা হয় ।

রাজকোষ নীতির উদ্দেশ্য :

( ১ ) অর্থনৈতিক বৃদ্ধি
( ২ ) সাম্য প্রতিষ্ঠা
( ৩ ) দেশীয় অর্থনীতির সমস্ত ক্ষেত্রের সামগ্রিক উন্নয়ন
( ৪ ) কর্মসংস্থান
( ৫ ) রপ্তানি বৃদ্ধি

রাজকোষ নীতির প্রকারভেদ :

( A ) প্রসারণ মূলক ( এক্সপ্যানশনারি ) রাজকোষ নীতি — এক্ষেত্রে একদিকে কর হার কমানো হয় , ফলে সঞ্চয় বাড়ে ; ব্যয়ের প্রবণতা বাড়ে ; উপভোক্তা ও ব্যবসায়ীরা অধিক মাত্রায় ক্রয় করেন ও ফলস্বরূপ চাহিদার বৃদ্ধি ঘটে । অপরদিকে , সরকারি ব্যয় বাড়ানো হয় , ফলে , দ্রব্য ও পরিষেবা ক্রয় করার জন্য উপভোক্তা ও ব্যবসায়ীদের কাছে ফান্ড আসে ; ফলস্বরূপ চাহিদার বৃদ্ধি ঘটে ।
( B ) সংকোচনমূলক ( কন্ট্রাকশনারি ) রাজকোষ নীতি – এক্ষেত্রে একদিকে কর হার বাড়ানো হয় , ফলে খরচ কমে ; ব্যয় প্রবণতা কমে , উপভোক্তা ও ব্যবসায়ীরা কম পরিমাণে ব্যয় করেন ও ফলস্বরূপ চাহিদার ঘাটতি হয় । অপরদিকে , সরকারি ব্যয় কমানো হয় , ফলে , দ্রব্য ও পরিষেবা ক্রয় করার জন্য উপভোক্তা ও ব্যবসায়ীদের কাছে ফান্ড কমে যায় ও ফলস্বরূপ চাহিদার ঘাটতি হয় ।

রাজকোষ নীতির অংশ :

( ১ ) রাজস্ব ( রেভিনিউ ) বাজেট : ব্যবসায়িক খাতের এক বছরের আয় ও ব্যয় রেভিনিউ বাজেটের অন্তর্ভুক্ত । যেমন- সেলস , পার্টেজ , স্যালারি , রেন্ট , ওয়েজ ইত্যাদি ।
( ২ ) মূলধনী ( ক্যাপিটাল ) বাজেট : মূলধনী ব্যয়ের ইনফ্লো এবং আউটফ্লো এই ক্যাপিটাল বাজেটের অন্তর্গত । অ্যাসেট সৃষ্টি করার ক্ষেত্রে যে ব্যয় হয় তাকে মূলধনী ব্যয় বলে । যেমন- প্ল্যান্ট ও মেশিনারি , শেয়ার , ফার্নিচার ইত্যাদি ।
( ৩ ) রাজস্ব আয় ( রেভিনিউ রিসিট ) : ট্যাক্স ও নন - ট্যাক্স রিসোর্স থেকে যে রাজস্ব আদায় করা হয় তা এই রেভিনিউ রিসিটের অন্তর্গত । প্রসঙ্গত ট্যাক্স রিসোর্স বিভিন্ন প্রকারের কর যেমন : আয় কর , কর্পোরেশন ট্যাক্স , এক্সাইজ ডিউটি ইত্যাদি । নন - ট্যাক্স রিসোর্স : ইন্টারেস্ট রিসিট , ইন্টারেস্ট ডিভিডেন্ড ইত্যাদি ।
( ৪ ) রাজস্ব ব্যয় ( রেভিনিউ এক্সপেণ্ডিচার ) : এটি কোনো প্রকার অ্যাসেট সৃষ্টি করে না । বিভিন্ন সরকারি খাতে ব্যয় এর অন্তর্গত । যেমন : স্যালারি , ইন্টারেস্ট পেমেন্ট , ডিফেন্স , সাবসিডি ইত্যাদি ।
( ৫ ) ক্যাপিটাল অ্যাকাউন্ট রিসিট : সম্পত্তি বিক্রয় করে বা ঋণ গ্রহণ করার মাধ্যমে যে মূলধন সংগ্রহ করা হয় , তা এই ক্যাপিটাল অ্যাকাউন্ট রিসিটের অন্তর্গত ।
( ৬ ) ক্যাপিটাল অ্যাকাউন্ট এক্সপেন্ডিচার : সম্পত্তি সৃষ্টি করতে যে ব্যয় হয় তা এর অন্তর্গত ।

রাজকোষ ঘাটতি : - ব্যয় যখন আয়ের থেকে বেশি হয় , রপ্তানি যখন আমদানির থেকে বেশি হয় অথবা দায় যখন সম্পদের থেকে বেশি হয় তখন ঘাটতি দেখা দেয় ।

ঘাটতির প্রকারভেদ :

( ১ ) রাজস্ব ঘাটতি ( রেভিনিউ ডেফিসিট ) : রাজস্ব ব্যয় ও রাজস্ব আয়ের পার্থক্য রাজস্ব ঘাটতি দ্বারা নির্দেশিত হয় ।
( ২ ) কার্যকরী রাজস্ব ঘাটতি ( এফেকটিভ রেভিনিউ ডেফিসিট ) : রাজস্ব ঘাটতি ও মোট মূলধনী সম্পদের পার্থক্য কার্যকরী রাজস্ব ঘাটতি দ্বারা নির্দেশিত হয় ।
( ৩ ) রাজকোষ ঘাটতি : সরকারি আয় ( রেভিনিউ রিসিট + নন ডেট ক্যাপিটাল রিসিট ) ও ব্যয়ের পার্থক্যকে রাজকোষ ঘাটতি বলা হয় । তবে এর মধ্যে নন - ডেট ক্যাপিটাল এক্সপেন্ডিচারকে ধরা হয় না ।
( ৪ ) বাজেট ঘাটতি : বাজেটের অন্তর্ভুক্ত মোট আয় ও ব্যয়ের পার্থক্যকে বলা হয় বাজেট ঘাটতি ।
( ৫ ) প্রাথমিক ঘাটতি : রাজকোষ ঘাটতি ও ইন্টারেস্ট পেমেন্টের পার্থক্যকে প্রাথমিক ঘাটতি দ্বারা নির্দেশ করা হয় ।

ডেফিসিট ফাইন্যান্সিং : সরকারি আয় - ব্যয়ের এই পার্থক্যকে পূরণ করাই ডেফিসিট ফাইন্যান্সিংয়ের মূল উদ্দেশ্য ।

ডেফিসিট ফাইন্যান্সিংয়ের পদ্ধতি :

( ১ ) মনিটাইজড ডেফিসিট : নতুন কারেন্সি প্রিন্ট করার মাধ্যমে ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ গ্রহণের মাধ্যমে ঘাটতি পূরণের পদ্ধতিকে মনিটাইজড ডেফিসিট বলা হয় । এই প্রিন্টেড কারেন্সিটিকে হাই পাওয়ার মানি বলা হয় । সাধারণ পরিস্থিতিতে এফআরবিএম অ্যাক্ট - এর আওতায় ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্ক এইরূপ কারেন্সি প্রিন্টিং - র অনুমোদন পায় না ।
( ২ ) ওয়েস অ্যান্ড মিন্স অ্যাডভান্স ( WMA ) : কেন্দ্রীয় সরকারের ব্যাঙ্কার হিসেবে ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্ক কেন্দ্রকে সাম্প্রতিক ঋণ প্রদান করে , এইভাবে রাজকোষ ঘাটতি পূরণ করা হয় । এক্ষেত্রে কোনো কোল্যাটারাল নেওয়া হয় না কিন্তু পেনাল ইন্টারেস্ট চার্জ করা হয় । রাজ্য সরকারের ক্ষেত্রে WMA অ্যাডভান্স দু'প্রকার , যথা - নর্মাল ও স্পেশাল । নর্মাল WMA হল অসুরক্ষিত ঋণ যেখানে ব্যাঙ্ক রেট প্রযোজ্য হয় । স্পেশাল WMA গভর্নমেন্ট সিকিউরিটির পরিবর্তে ইস্যু করা হয় ।

ফিস্কাল রেসপনসিবিলিটি অ্যান্ড বাজেট ম্যানেজমেন্ট অ্যাক্ট , 2003 :- ফিস্কাল ম্যানেজমেন্ট - র উদ্দেশ্যে দেশব্যাপী একটি স্বচ্ছ ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে এই আইন প্রণয়ন করা হয় , যার মূল উদ্দেশ্য রাজস্ব ও রাজকোষ ঘাটতি কমিয়ে ফিস্কাল স্টেবিলিটি মেন্টেন করা ।

সরকারি ব্যয় : - কেন্দ্রের কনসোলিডেটেড ফান্ডের পরিবর্তে যে ঋণ গ্রহণ করা হয় তাকে পাবলিক ডেট বলে । পাবলিক ডেট দু - প্রকারের , যথা- অন্তর্দেশীয় ( ইন্টার্নাল ) বহির্দেশীয় ( এক্সটার্নাল ) ঋণ ।

ট্রেজারি বিল বিক্রয় করা বা দেশীয় আর্থিক বাজার থেকে ঋণ গ্রহণ করাকে অন্তর্দেশীয় ঋণ বলা হয় । অপরদিকে , বৈদেশিক ঋণ , আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ গ্রহণ , বহির্দেশীয় বাণিজ্যিক ঋণ ( এক্সটার্নাল কমার্শিয়াল বরোয়িং ) , এন আর আই ডিপোজিট , ট্রেড ক্রেডিট , দ্বি - পাক্ষিক ও বহু - পাক্ষিক ঋণ ইত্যাদি বহির্দেশীয় ঋণের অন্তর্গত ।

রুপি ডেট : রুপি - ডিনোমিনেটেড এক্সটার্নাল ডেটকে বলা হয় রুপি ডেট । অন্যান্য সরকারি দায়ের মধ্যে পড়ে প্রভিডেন্ট ফান্ড অ্যাকাউন্ট , রিজার্ভ ফান্ড ডিপোজিট , অন্যান্য অ্যাকাউন্ট ইত্যাদি ।

রাজকোষ নীতি গ্রহণের ফলে সৃষ্ট বিভিন্ন প্রকারের অর্থনৈতিক অবস্থা :

ফিস্কাল ড্রাগ : মুদ্রাস্ফীতির কারণে যখন আয় কর বৃদ্ধি পায় , কিন্তু প্রকৃত ক্রয় ক্ষমতা বাড়ে না , সেই পরিস্থিতিকে ফিস্কাল ড্রাগ বলা হয় ।
ফিস্কাল নিউট্রালিটি : যখন করের প্রভাব ও পাবলিক স্পেন্ডিং - এর নিট ফল নিরপেক্ষ হয় , তাকে ফিস্কাল নিউট্রালিটি বলা হয় ।
ক্রাউডিং আউট : সরকরি ঋণ অত্যধিক বেড়ে গেলে , অর্থনীতিতে অর্থের তারল্য হ্রাস পায় , ফলে সুদের হার বৃদ্ধি পায় ও বেসরকারি বিনিয়োগ ব্যাহত হয় ।
পাম্প প্রাইমিং : অর্থনৈতিক মন্দার সময় ডেফিসিট ফাইন্যান্সিং ও সরকারি ব্যয়ের মাধ্যমে দেশীয় অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার প্রক্রিয়াকে পাম্প প্রাইমিং বলা হয় ।
টুইন ডেফিসিট : একই সঙ্গে কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ডেফিসিট ও ফিস্কাল ডেফিসিটকে টুইন ডেফিসিট বলা হয় ।
সভেরেন ডেট ক্রাইসিস : বৈদেশিক মূল্যে বৈদেশিক ঋণ গ্রহণকরার পর সেটি মেটাতে অক্ষম হলে এই প্রকার পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় ।
স্টেট ডেভেলপমেন্ট লোন ( SDL ) : রাজ্য সরকারি ঋণের ক্ষেত্রে ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্ক যে ডেট সিকিউরিটিজ ইস্যু করে তাকে এসডিএল বলা হয় ।
অফ বাজেট ফিনান্সিং : সরকারের বাজেট বহির্ভূত ব্যয়কে বলা হয় অফ বাজেট ফাইন্যান্সিং । যেমন- কোনো সেতু নির্মাণের লক্ষ্যে স্পেশাল পারপাস ভেহিকেল গঠন করা যা বাজেটের অন্তর্ভুক্ত নয় ।

Thanks for your comment. We review and answer your comment.

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post