জীবাশ্ম, শিলাচক্র, শিলার ব্যবহার এবং আগ্নেয় শিলা , পাললিক শিলা , ও রূপান্তরিত শিলার তুলনা

জীবাশ্ম (Fossils) :

জীবাশ্ম কাকে বলে ? জীবদেহ যখন পাথরে পরিণত হয় , তখন তাকে জীবাশ্ব বলে ( জীব + অশ্ম = জীবাশ্ম , অশ্ম = পাথর ) । পাললিক শিলা গঠনকালে অনেক সময় মৃত সামুদ্রিক প্রাণী , উদ্ভিদ প্রভৃতির দেহ চাপা পড়ে প্রস্তরীভূত হয়ে যায় এবং পাথরের স্তরের মধ্যে তার ছাপ থেকে যায় । এইভাবে উদ্ভিদ ও প্রাণীর দেহ পাথরে পরিণত হলে তাকে জীবাশ্ম বলে ।

জীবাশ্ম (Fossils)
উদ্ভিদ জীবাশ্ম এবং প্রাণী জীবাশ্ম 


পাললিক শিলার স্তরের মধ্যে জীবাশ্ম পাওয়া যায় কেন ? নদী , সমুদ্র বা হ্রদের তলায় স্তরে স্তরে পলি জমা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণীদের দেহও তার মধ্যে চাপা পড়ে । পলি জমাট বেঁধে পাথরে পরিণত হওয়ার সময় এইসব উদ্ভিদ ও প্রাণীর দেহও আস্তে আস্তে জমাট বেঁধে পাথরে পরিণত হয়ে জীবাশ্ম সৃষ্টি করে । এবং শিলান্তরের ওপর তার ছাপ দেখা যায় । এইজন্য জীবাশ্ম কেবল পাললিক শিলাতেই দেখতে পাওয়া যায় । জীবাশ্ম পৃথিবীর আদিকালের জীবজগৎ সম্পর্কে গবেষণার পক্ষে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ।

আজকের পৃথিবীর উচ্চ পর্বতগুলি ( হিমালয় , অ্যান্ডিজ , রকি প্রভৃতি ) যে এককালে সমুদ্রের নীচে জমে থাকা পলি থেকে সৃষ্টি হয়েছিল , ভূ - তত্ত্ববিদেরা তা ঐ সমস্ত পর্বতের পাললিক শিলা থেকে পাওয়া জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণীর জীবাশ্ম থেকে প্রমাণ করেছেন ।

শিলাচক্র (Rock Cycle) :

পৃথিবীর বর্হিভাগের কঠিন আবরণকে ভূ - ত্বক বলা হয় । ভূ - ত্বক যে উপাদানে গঠিত সাধারণভাবে তাদের শিলা বলে । ভূ - পৃষ্ঠের শিলাসমূহ সময়ের সঙ্গে প্রতিনিয়তই চক্রাকারে পরিবর্তিত হয় , যেমন : -

শিলাচক্র (Rock Cycle)
শিলাচক্র


( 1 ) ভূ - গর্ভের উত্তপ্ত গলিত পদার্থ বা ম্যাগমা ভূগর্ভের ছিদ্রপথ অথবা আগ্নেয়গিরির মুখ দিয়ে ভূপৃষ্ঠের ওপর লাভা রূপে প্রবাহিত হওয়ার সময় ঠাণ্ডা বাতাসের সংস্পর্শে এসে শীতল ও কঠিন হয়ে আগ্নেয় শিলার সৃষ্টি করে ( যেমন : ব্যাসল্ট ) ।
( ২ ) ভূ পৃষ্ঠের এই আগ্নেয় শিলা আবহবিকারের ফলে প্রতিদিন চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে বালি , কাঁকড় ও নুড়িতে পরিণত হয় । অন্যদিকে বায়ু প্রবাহ , নদীস্রোত , হিমবাহ , সমুদ্র তরঙ্গ প্রভৃতি এদের পরিবহন করে সমুদ্র , হ্রদ ও নদীর তলদেশে পলি হিসেবে সঞ্চিত করে , কালক্রমে যা জল এবং পলিস্তরের পারিপার্শ্বিক চাপে জমাট বেঁধে পাললিক শিলার সৃষ্টি করে ( যেমন : বেলেপাথর , চুনাপাথর , নুড়ি পাথর প্রভৃতি ) ।
( ৩ ) আগ্নেয় ও পাললিক শিলা অত্যধিক চাপ ও তাপে পরিবর্তিত হয়ে রূপান্তরিত শিলায় পরিণত হয় ( যেমন : মার্বেল , কোয়ার্টজাইট প্রভৃতি ) ।
( 8 ) শুধুমাত্র আগ্নেয় বা পাললিক শিলাই নয় , অনেক রূপান্তরিত শিলাও পরবর্তীকালে আবার রূপান্তরিত হতে পারে ।

অর্থাৎ আগ্নেয়শিলা , পাললিক শিলা , ও রূপান্তরিত শিলাগুলো পরস্পরের থেকে বিচ্ছিন্ন নয় । সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই সমস্ত শিলা প্রতিনিয়তই পরিবর্তিত হয় । এই পরিবর্তন ক্রমন্বয়ে ও চক্রাকারে ঘটে থাকে , তাই একে শিলাচক্র বলে । শিলাচক্রের ফলে পৃথিবীর ভূমিরূপের নানাম রকম পরিবর্তন হয় ।

ভূ-প্রকৃতি গঠনে শিলার প্রভাব এবং শিলার ব্যবহার (Effect of rocks on the formation of topography and the use of rocks) :

বিভিন্ন রকমের ভূমিরূপ গঠনে বিভিন্ন ধরনের শিলার স্পষ্ট প্রভাব দেখা যায় , যেমন :

( ১ ) গ্রানাইট শিলা দিয়ে গঠিত অঞ্চলের আকৃতি কিছুটা গোলাকার হয় ।
( ২ ) ব্যাসন্ট শিলা গঠিত অঞ্চলের আকৃতি চ্যাপ্টা ।
( ৩ ) নরম চুনাপাথর দিয়ে গঠিত অঞ্চলের ভূমি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে প্রচুর গহ্বর ও ফাটল সৃষ্টি হয় ।
( ৪ ) গ্রানাইট , ব্যাসল্ট প্রভৃতি আগ্নেয় শিলা গঠিত পার্বত্য অঞ্চল সহজে ক্ষয়প্রাপ্ত হয় না , কিন্তু পাললিক শিলা দিয়ে গঠিত পার্বত্য অঞ্চল সহজেই ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে সমভূমি ও সমপ্রায় ভূমিতে পরিণত হয় ।
( ৫ ) অনেক সময় শক্ত শিলায় গড়া অঞ্চল কম ক্ষয় পেয়ে আশপাশের বেশী ক্ষয়ে যাওয়া নরম শিলায় গঠিত অঞ্চল থেকে আলাদা হয়ে উঁচুতে থেকে যায় , একে ক্ষয়জাত পর্বত বলে । কম ক্ষয় পাওয়া অবশিষ্ট অংশ পর্বতে পরিণত হয় বলে একে অবশিষ্ট পর্বত ( Residual Mountain ) - ও বলা হয় ।
( ৬ ) নদীপথে কোমল ও কঠিন শিলাস্তরের বিশেষ অবস্থান জলপ্রপাত সৃষ্টিতে সাহায্য করে । পার্বত্য প্রবাহে নদীর গতিপথে আড়াআড়িভাবে কোন কঠিন শিলা থাকলে , সেই কঠিন শিলা পাশের কোমল শিলা থেকে কম ক্ষয় পাওয়ায় উঁচু হয়ে থাকে এবং নদী কঠিন শিলার ওপর থেকে নীচের ক্ষয়প্রাপ্ত কোমল শিলায় পড়ে জলপ্রপাতের সৃষ্টি করে ।

শিলার ব্যবহার : শিলা মানুষের নানা প্রয়োজনে ব্যবহৃত হয় । পাললিক শিলাস্তরে কয়লা , খনিজ তেল , প্রাকৃতিক গ্যাসের দেখা মেলে । পাললিক ও রূপান্তরিত শিলা বাড়ী - ঘর তৈরীর কাজে লাগে । আগ্নেয় শিলা রাস্তা - ঘাট নির্মাণের কাজে ব্যবহৃত হয় ।

আগ্নেয় শিলা , পাললিক শিলা , ও রূপান্তরিত শিলার তুলনা (Comparison of volcanic rock, sedimentary rock, and metamorphic rock) :

আগ্নেয় শিলা পাললিক শিলা রূপান্তরিত শিলা
উত্তপ্ত তরল অবস্থা থেকে তাপ বিকিরণের ফলে শীতল ও কঠিন হওয়ার সময়ে পৃথিবীর অভ্যন্তরে যে শিলার সৃষ্টি হয় তাকে আগ্নেয় শিলা বলে । এটি ভূ - ত্বকের প্রথম পর্যায়ের শিলা বা প্রাথমিক শিলা । সমুদ্র , হ্রদ বা নদীর তলদেশে স্তরে স্তরে পলি সঞ্চিত হয়ে জমাট বেঁধে পাললিক শিলার সৃষ্টি হয় । তাই এটি দ্বিতীয় পর্যায়ের শিলা । অত্যধিক চাপ ও তাপে অথবা রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় আগ্নেয় ও পাললিক শিলা নতুন আর এক ধরনের শিলায় রূপান্তরিত হয়ে রূপান্তরিত শিলার সৃষ্টি হয় । সুতরাং রূপান্তরিত শিলা হল তৃতীয় পর্যায়ের শিলা ।
আগ্নেয় শিলার মধ্যে কোন স্তর থাকে না । পাললিক শিলার স্তরগুলো স্পষ্ট বোঝা যায় । রূপান্তরিত শিলায় সাধারণত স্তর থাকে না , আর থাকলেও পাললিক শিলাস্তরের মত স্পষ্ট বোঝা যায় না ।
আগ্নেয় শিলার মধ্যে জীবাশ্ম থাকে না । পাললিক শিলার স্তরের মধ্যে উদ্ভিদ ও প্রাণীর জীবাশ্ম পাওয়া যায় । প্রচণ্ড তাপ ও চাপে নষ্ট হয়ে যাওয়ার ফলে পাললিক শিলা থেকে উৎপন্ন রূপান্তরিত শিলার মধ্যে জীবাশ্ম দেখা যায় না ।
আগ্নেয় শিলা পাললিক শিলার তুলনায় কঠিন ও ভারী এবং তা সহজেই ক্ষয়প্রাপ্ত হয় না । তিন রকম শিলার মধ্যে পাললিক শিলা অপেক্ষাকৃত হালকা ও সহজে ক্ষয়প্রাপ্ত হয় । পাললিক শিলা থেকে রূপান্তরিত হলে সেই শিলা আগের থেকে কঠিন হয় ।
আগ্নেয় শিলা স্তরহীন , কেলাসিত এবং এই শিলায় স্ফটিক দেখা যায় । পাললিক শিলা স্তরযুক্ত এবং পাললিক শিলায় স্ফটিক থাকে না । রূপান্তরিত শিলা কেলাসিত , স্ফটিক যুক্ত এবং স্তরহীন ।
আগ্নেয় শিলায় আকরিক লোহা , ম্যাঙ্গানিজ , তামা , রূপা , সোনা প্রভৃতি ধাতব খনিজ পদার্থ পাওয়া যায় । পাললিক শিলা থেকে সাধারণত কয়লা , খনিজ তেল , প্রাকৃতিক গ্যাস প্রভৃতি পাওয়া যায় । রূপান্তরিত শিলা থেকে সাধারণত অভ্র , বিভিন্ন রকমের মূল্যবান পাথর প্রভৃতি অধাতব খনিজ পদার্থ পাওয়া যায় ।

Thanks for your comment. We review and answer your comment.

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post