ভারতের সংগীত সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্যাবলি

ভারতীয় সংস্কৃতির প্রাণ রয়েছে ঐতিহ্যবাহী সংগীতের মধ্যে । কথিত আছে যে , নারদমুনি পৃথিবীতে সংগীত শিল্পের শুভ সূচনা ঘটিয়েছেন । তিনি তাঁর শিষ্যদের যে শব্দ উচ্চারণ শিক্ষা দিয়েছিলেন তাই ' নাদ ব্রহ্ম ' নামে পরিচিত । ' নাদ ' কথার অর্থ হল শব্দ যা হল সৃষ্টির মূল ভিত্তি । ঋকবেদ , যজুর্বেদ ও উপনিষদে সংগীতের উল্লেখ রয়েছে । বৈদিক যুগে বলিদানের একটি অন্তর্নিহিত অংশ ছিল গান । বিশেষ পুরোহিত ' উদ্গাতার ' ঋকবেদের স্তব গাইতেন । পরবর্তী ক্ষেত্রে সমস্ত সংগীত ' সমন ' ( Summon ) থেকে বিকশিত হয়েছে বলে মনে করা হয় । সংগীতে বিজ্ঞানকে বলা হয় ' গন্ধর্ব বেদ ' যা ' সামবেদের একটি উপবেদ ।

ভারতীয় সংগীতের অবয়ব গঠনতন্ত্র :

ভারতীয় সংগীতের বিভিন্ন প্রকার ও ধরন সম্পর্কে জানার আগে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের অবয়ব গঠনতন্ত্র সম্পর্কে জানা ও বোঝা বিশেষ উপযোগী । ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের তিনটি প্রধান স্তম্ভ রয়েছে— যথা ( ১ ) স্বর ( ২ ) রাগ ( ৩ ) তাল ।

১। স্বর ( Swara ) :

প্রাচীনযুগে ' স্বর ' শব্দটি ' বেদ ' আবৃত্তির সঙ্গে যুক্ত ছিল । সময়ের সাথে সাথে শব্দটি ' নোট ' এবং ' স্কেল ডিগ্রি ' - তে সংগায়িত হতে থাকে । নাট্যাচার্য ভরত তার নাট্যশাস্ত্রে স্বরগুলিকে ২২ টি নোট স্কেলে বিভক্ত করেছেন । বর্তমানে হিন্দুস্থানি সংগীতের স্বরলিপি পদ্ধতি সংগায়িত করা হয়েছে – সা , রে , গা , মা , পা , ধা , নি , সা এই সাতটি স্বরকে একসঙ্গে বলা হয় সপ্তক বা সারগম ( Sargam ) ।

মাত্রার নাম কাজ সংক্ষিপ্ত রূপ
সাদজা ( Shadja ) টোনিক ( Tonic ) সা ( Sa )
ঋষভ ( Rishabha ) সুপারটোনিক ( Supertonic ) রে ( Re )
গান্ধার ( Gandhara ) মধ্যম ( Mediant ) গা ( Ga )
মধ্যমা ( Madhyama ) উপপ্রধান ( Sub - dominant ) মা ( Ma )
পঞ্চমা ( Panchama ) প্রধান ( Dominant ) পা ( Pa )
ধৈবত ( Dhaivata ) উপ - মধ্যম ( Sub - Meditant ) ধা ( Dha )
নিশাদা ( Nishada ) সাব - টোনিক ( Saubtonic ) নি ( Ni )

স্বর আবার শ্রুতির থেকে আলাদা । শ্রুতি হল ‘ মাত্রার ’ ক্ষুদ্রতম গ্রেডেশান যা বীপ্সার গুণমানকে প্রতিনিধিত্ব করে । ২২ টি শ্রুতি রয়েছে যার মধ্যে ১২ টি শ্রবণযোগ্য । এই ১২ টির মধ্যে ৭ টি শুদ্ধ স্বর এবং ৫ টি বিকৃত স্বর ।

২। রাগ ( Raga ) :

' রাগ ' শব্দটি সংস্কৃত শব্দ ' রঞ্জ ' থেকে এসেছে , যার আক্ষরিক অর্থ আনন্দ করা বা কাউকে খুশি করা । রাগ সুরের ভিত তৈরি করে । এটি সুর বা স্বরের সমন্বয়ে গঠিত হয় । প্রতিটি রাগে ন্যূনতম ৫ টি নোট থাকা উচিত । সেই হিসেবে রাগ তিন প্রকার যথা –

ওদাভা রাগ : এটি পেন্টোটোনিক রাগ এবং এর ৫ টি নোট রয়েছে ।
সাধবা রাগ : এটি হেক্সাটোনিক রাগ এবং এর ৬ টি নোট রয়েছে ।
সম্পূর্ণ রাগ : এটি হেপ্টাটোনিক রাগ এবং এর ৭ টি নোট রয়েছে ।

৩। তাল ( Tall ) :

বিটের ছন্দবদ্ধ গ্রুপিংকে বলা হয় তাল । এই ছন্দবদ্ধ চক্রের পরিসীমা ৩ থেকে ১০৮ বিটের । ভারতীয় ছন্দের গঠনগত মৌলিক একক হল থিসরা ( ৩ ) , চতুস্রা ( ৪ ) , খণ্ড ( ৫ ) , মিশ্র ( ৬ ) এবং সংকীর্তন ( ৭ ) । ভরতমুনি ৩২ টি তালের কথা উল্লেখ করলেও বর্তমানে ভারতীয় সংগীত ক্ষেত্রে ১২০ টিরও বেশি তাল রয়েছে ।

ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতে মূলত তিনটি প্রধান স্তম্ভ ছাড়াও আর যে কয়টি জিনিস রয়েছে নীচে তা আলোচনা করা হল -

◼ রস : শিল্পী এবং দর্শকের মধ্যে প্রতিক্রিয়াজনিত আবেগের বহিঃপ্রকাশ হল রস । এই রস সৃষ্টির অন্যতম মাধ্যম হল সংগীত এবং যন্ত্র । রসকে ‘ নান্দনিক আনন্দ ’ ও বলা হয় । প্রাথমিক পর্বে আটটি রসের উল্লেখ থাকলে বর্তমানে নয়টি রস দর্শককে রসসিক্ত করে মেজাজকে নিয়ন্ত্রণ করে । নীচে নয়টি রস ও তার ক্রিয়া দেওয়া হল –

রস ক্রিয়া
শৃঙ্গার ভালোবাসা / প্রেম
হাস্য হাসি / কৌতুক / ভাঁড়
করুণ বিচ্ছেদ
রুদ্র ক্রোধ / রাগ
ভয়ানক ভয়াবহতা
বীর বীরত্ব
অদ্ভুত বিস্ময়
বীবৎস বিরাগ
শান্ত শান্তি

◼ ঠাট : রাগগুলিকে বিভিন্ন শ্রেণিতে বিভক্ত করার পদ্ধতি হল ঠাট । বর্তমানে হিন্দুস্থানি ধ্রুপদ সংগীতে ১০ টি ঠাটকে স্বীকৃতি জানানো হয়েছে । ঠাট আরোহী নোটে গাওয়া হয় । ঠাটে ন্যূনতম সাতটি নোট থাকবে এবং সেগুলি ঊর্ধ্বক্রমানুসারে সজ্জিত থাকে । বর্তমানে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত ১০ টি ঠাঁট হল –

√ বিলাবল , √ আশাবরি , √ টোডি , √ মারওয়া , √ পূর্বী , √ খামাজ , √ ভৈরবী , √ কল্যান , √ ভৈরব , √ কাফি

ঠাট ও রাগের প্রধান প্রাথক্য

গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট ঠাট রাগ
উৎপত্তি এটি হলো একটি স্কেল যা ১২ টি নোট থেকে উৎপত্তি হয়। রাগগুলি ঠাট থেকে উৎপত্তি হয়।
নোটের সংযোগ অন্ততপক্ষে ৫টি নোট থাকা আবশ্যক। ন্যূনতম ৫টি নোট থাকা বাঞ্চনীয়।
নোটের প্রকৃতি কেবলমাত্র আরোহী নোট লক্ষ্য করা যায়। এতে আরোহী এবং অবরোহী নোট অবশ্যই থাকে।
স্বর মাধুর্য সংগীতকে শ্রুতি মধুর বা সুরেলা করার জন্য অত্যাবশ্যকীয় নয়। সংগীতকে সুরেলা করার জন্য রাগকে অতি অবশ্যই প্রয়োজন।
গুরুত্বপূর্ণ নোট ঠাটে বাদী (Vaadi) এবং সম্বাদি (Samvaadi) থাকে না। রাগে বাদী (Vaadi) এবং সম্বাদি (Samvaadi) থাক।

এখানে ধ্রুপদী / শাস্ত্রীয় সংগীত নিয়ে আলোচনা করা হলো :-

ভারতীয় সংগীতের ইতিহাসে দু’প্রকার শাস্ত্রীয় সংগীত আছে যথা ( ১ ) হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সংগীত ( সাধারণত উত্তর ভারতে লক্ষ্য করা যায় ) ( ২ ) কর্নাটকী শাস্ত্রীয় সংগীত ( সাধারণ দক্ষিণ ভারতে লক্ষ্য করা যায় ) ।

ভারতীয় সংগীতের শ্রেণীবিভাগ

হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সংগীত :

ভরতের নাট্যশাস্ত্রের উভয় ধরনের সংগীতের শিকড় থাকলেও চতুর্দশ শতকে তা বিচ্ছিন্ন হয়েছিল । হিন্দুস্থানি সংগীতের শাখাটি বাদ্যযন্ত্র কাঠামোর উপর অধিক কেন্দ্রীভূত । হিন্দুস্থানি শাখাটি শুদ্ধ স্বর সপ্তক অথবা ' Octave of Natural notes '- এর স্কেল বেশি গ্রহণ করেছে । হিন্দুস্থানি সংগীত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি সংগীত শিক্ষা ক্ষেত্রের সময় , ঋতু এবং মেজাজ তত্ত্বকে কঠোরভাবে অনুসরণ করতে শুরু করে । সময় , ঋতু এবং মেজাজ - এর রীতি অনুসরণ করে হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সংগীতের প্রধান ছয়টি রাগ রয়েছে । নীচে তা দেওয়া হল –

রাগের নাম সময়কাল ঋতুকাল মেজাজ
হিন্দোল ( Hindol ) রাত্রিবেলা বসন্তকাল যুব দম্পতির মধুর ভালোবাসা
দীপক ( Deepak ) বিকেলবেলা গ্রীষ্মকাল ভালোবাসা এবং সহানুভূতি
মেঘা ( Megha ) সকালবেলা বর্ষাকাল শান্তি , প্রশান্তি এবং উৎসাহ
শ্রী ( Shree ) বিকেলবেলা শীতকাল ভালোবাসা
মালকোশ ( Kaushiki ) মধ্যরাত্রিবেলা শীতকাল তারুণ্যের প্রেম
ভৈরবী ( Bhairavi ) সকালবেলা শরৎকাল শান্তি ও ভক্তি

হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সংগীতের অনেকগুলি রূপশৈলী রয়েছে । নীচের তাদের বিষয়ে আলোচনা করা হল -

( A ) ধ্রুপদ ( Dhrupad ) :

  • এটি হিন্দুস্থানি সংগীতের সর্বাপেক্ষা প্রাচীনতম শৈলী যাকে সমস্ত শৈলীর জননী বলা হয় ।
  • এর একটি বৈদিক রীতি পাওয়া গেছে । মন্দির থেকে উদ্ভূত বলে একে মন্দির সংগীত ও বলা হয় ।
  • এটি একটি কাব্যিক রূপ যাতে রাগের বর্ধিত উপস্থাপন শৈলী , লক্ষ্য করা যায় ।
  • ধ্রুপদ শুরু হয় শব্দ ( Words ) ছাড়া আলাপ দিয়ে ।
  • ব্রজভাষায় গানের কথা রচিত হয় যাতে বীর এবং শৃঙ্গার রস থাকে ।
  • এর মূল থিম প্রধানত ধর্মীয় এবং ভক্তিমূলক ।
  • বাণী পদ্ধতির উপর ভিত্তি করে ধ্রুপদের কিছু বিখ্যাত ঘরানা রয়েছে সেগুলি হল - ( ১ ) দাগরি বাণী ঘরানা ( ২ ) দ্বারভাঙ্গা ঘরানা ( ৩ ) বেটিয়া ঘরানা ( ৪ ) তালবন্দী ঘরানা
  • ধ্রুপদী সংগীতের কয়েকজন সংগীতশিল্পী হলেন - রামচতুর মল্লিক , প্রেমকুমার মল্লিক , সিয়ারাম তেওয়ারি , গুন্ডেচা ভ্রাতৃদ্বয় , ইন্দ্র কিশোর মিশ্র প্রমুখ

( B ) খেয়াল ( Khayal ) :

  • ' খেয়াল ' শব্দটি পার্সি শব্দ থেকে নেওয়া হয়েছে যার অর্থ হল ' ধারনা ' বা ' কল্পনা '।
  • এই শৈলীর উৎস হলেন আমীর খসরু ।
  • খেয়াল সাধারণত ২ থেকে ৮ লাইনের ছোট গান ।
  • খেয়াল রচনাটিকে বন্দিশ হিসেবেও উল্লেখ করা হয় ।
  • এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল একটানা সুর ঝংকার বা তান ।
  • একটি সাধারণ খেয়ালে সাধারণত দুটো গান ব্যবহার করা হয় –
    ( i ) বাদা খেয়াল : ধীর লয়ে গাওয়া হয় ।
    ( ii ) ছোটো খেয়াল : দ্রুত লয়ে গাওয়া হয় ।
  • খেয়ালের অনেকগুলি ঘরানা লক্ষ্য করা যায় যথা – দিল্লি , পাতিয়ালা , আগ্রা , গোয়ালিয়র , কিরানা , আত্রৌলি জয়পুর ।
  • এই শৈলীর কয়েকজন সংগীতশিল্পী হলেন – নাথু খান , বিষ্ণু পালুসকার , পণ্ডিত ভীম সেন যোশী , গাঙ্গুবাঈ হাঙ্গেল , বিজয় কিচলু , বড়ে গুলাম আলি খান , পণ্ডিত রত্তন মোহন শর্মা প্রমুখ

( C ) ঠুমরি ( Thumri ) :

  • এটি মিশ্র রাগগুলির উপর ভিত্তি করে রচিত এবং এটি সেমি ক্লাসিক্যাল ভারতীয় সংগীত হিসেবে বিবেচিত হয় ।
  • গানগুলি প্রকৃতিতে রোমান্টিক বা ভক্তিপূর্ণ হয় ।
  • সংগীতগুলি অধিকাংশ ক্ষেত্রে মহিলা কণ্ঠে গাওয়া হয় ।
  • ঠুমরিকে অন্য যে নামে ব্যবহার করা হয় তা হল দাদরা , হোরি , কাজরি , সাওয়ান , ঝোলা এবং চৈতি ।
  • সাধারণত দু'ধরনের প্রধান ঠুমরি লক্ষ্য করা যায় , যথা -
    ( i ) পূর্বী ঠুমরি : এটি ধীর লয়ে গাওয়া হয় ।
    ( ii ) পাঞ্জাবি ঠুমরি : এটি দ্রুত লয়ে গাওয়া হয় ।
  • ঠুমরির প্রধান দুটি ঘরানা হল বেনারস এবং লক্ষ্ণৌ ।
  • ঠুমরির বিশিষ্ট সংগীতশিল্পী হলেন- বেগম আখতার

( D ) টপ্পা ( Tappa ) :

  • উট চালকের মুখোৎসারিত লোকগান থেকে টপ্পার উৎপত্তি ঘটেছে অষ্টাদশ শতকে ।
  • এই শৈলীতে ছন্দটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে ।
  • টপ্পার সাহিত্যিক নাম হল ' লাফ ’ বা ‘ ঝাপ ' ।
  • এই ঘরানার কয়েকজন শিল্পী হলেন- মিয়ান সোদি পণ্ডিত লক্ষণ রাও , শানু খুরানা প্রমুখ ।

( E ) গজল ( Gazal ) :

  • এটি সংগীতের চেয়ে মূলত কাব্য আবার ঠুমরির চেয়ে সংগীতের মতো ।
  • একটি গজল কখনো ১২ টি শ্লোক ( Couplets ) অতিক্রম করে না ।
  • মুসলিম শাসকদের পৃষ্ঠ পোষকতায় গোলকুণ্ডা ও বিজাপুরে এটির বিকাশলাভ ঘটেছিল ।
  • অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দী হল গজলের স্বর্ণযুগ ।
  • গজলের প্রধান কেন্দ্র হল লক্ষ্ণৌ এবং দিল্লি ।
  • কয়েকজন কিংবদন্তী গজল শিল্পী হলেন- মহম্মদ ইকবাল , মির্জা গালিব , রুমি , হাফেজ , কাজী নজরুল ইসলাম

( F ) তারানা ( Tarana ) :

  • এটি কেবলমাত্র বিনোদনের উদ্দেশ্যে রচিত হয়েছে যেখানে কয়েকটি অর্থপূর্ণ শব্দ রয়েছে ।
  • এটি সাধারণত দ্রুত লয়ে গাওয়া হয় ।
  • উত্তর ভারতে এই ঘরানার সংগীত খুবই জনপ্রিয় ।

( G ) দাদরা ( Dadra ) :

  • ঠুমরির সঙ্গে - এর গভীর সাদৃশ্য রয়েছে ।
  • সংগীতের কথাগুলো ঠুমরির মতোই প্রেমময় ।
  • দাদরাতে একাধিক অন্তরা থাকে ।
  • সংগীতশিল্পীরা রীতি মেনে ঠুমরির পরেই দাদরা পরিবেশন করেন ।

( H ) ধামর - হোরি ( Dhamar Hori ) :

  • এর সংগীতগুলি ধ্রুপদের অনুরূপ তবে প্রধানত হোলি উৎসবের সঙ্গে যুক্ত ।
  • সংগীতের মধ্য দিয়ে কৃষ্ণ ভজনা করা হয় ।
  • সংগীতগুলি জন্মাষ্টমী , রামনবমী , হোলি প্রভৃতি উৎসব উপলক্ষ্যে দাদরা তালে গাওয়া হয় ।
  • সংগীতে ' রাধা - কৃষ্ণের ' প্রেমের স্বরূপ প্রস্ফুটিত হয় ।

( I ) চতুরঙ্গ (Chaturanga) :

  • চারটি অংশে গানের রচনা নির্দেশ করে ।
  • দ্রুত খেয়াল , তারানা , স্বরগম এবং পরান - এই চারটি অংশ তবলা বা পাখোয়াজের সাহায্যে পরিবেশিত হয় ।

( J ) রাগসাগর ( Ragsagar ) :

  • একটি সম্পূর্ণ গানের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন অনুচ্ছেদে ভিন্ন ভিন্ন রাগের প্রকাশ লক্ষ্য করা যায় ।
  • গানে ৪ থেকে ১২ টি রাগের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায় ।

( K ) কাওয়ালি ( Qawwali ) :

  • এই রীতি আমীর খসরুর সময়কালে পরিবেশন শুরু হয়েছিল ।
  • এর মধ্য দিয়ে ইসলাম ধর্মের সম্প্রচারক আল্লার বন্দনা করা হয় ।
  • মুসলিমদের উরস উৎসব উপলক্ষ্যে এই গান পরিবেশিত হয় ।

কর্নাটকী শাস্ত্রীয় সংগীত :

বিদ্যারণ্যের সংগীত সার'কে দক্ষিণী ব্যবস্থার অগ্রদূত হিসেবে গণ্য করা হয় । সপ্তদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে ভেঙ্কটমাখিন ' চতুৰ্দণ্ডী প্রকাশিকা ' নামক এক গ্রন্থ রচনা করেন যা হয়ে ওঠে কর্নাটকী ব্যবস্থার ভিত্তি । কর্নাটকী সংগীতটি কৃতি ( Kriti ) ভিত্তিক এবং সাহিত্য ও বাদ্যযন্ত্রের উপর বিশেষভাবে আলোকপাত করা হয় । ' কৃতি ' হল একটি অত্যন্ত বিবর্তনশীল বাদ্যযন্ত্র ভিত্তিক সংগীত সমাহার যা একটি নির্দিষ্ট রাগ , তাল এবং ছন্দের চক্রে আবর্তিত হয় । কর্নাটকী সংগীতের প্রতিটি রচনার কতগুলো অংশ লক্ষ্য করা যায় । যথা -
( i ) পল্লবী : সংগীতের প্রথম বা দ্বিতীয় থিম্যাটিক লাইনকে বলা হয় ' পল্লবী ' । এই অংশটি প্রায় প্রতিটি স্তবকে পুনরাবৃত্ত হয় ।
( ii ) অনুপল্লবী : পল্লবীর পরের দুটো লাইনকে বলা হয় অনুপল্লবী । এটি শুরুতে গাওয়া হয় আবার কখনো কখনো গানের শেষের দিকেও গাওয়া হয় , তবে প্রতিটি মন্তব্যের শেষে গাওয়ার বাধ্যবাধকতা নাই ।
( iii ) বর্নম : এটি এক ধরনের রচনা যা সাধারণত সংগীত কথন বা আবৃত্তির শুরুর দিকে গাওয়া হয় । এই সংগীত কথন শ্রোতাদের ভাবজগতে নিয়ে যেতে সাহায্য করে । এর দুটো অংশ যথা ( ১ ) পূর্বাঙ্গ বা প্রথমার্ধ এবং ( ২ ) উত্তরাঙ্গ বা দ্বিতীয়ার্ধ ।
( iv ) রাগমালিকা : এটি সংগীতে অন্তিম বা শেষ অংশ । এই অংশটি একাকী গাওয়া শিল্পীর ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ অংশ যা শিল্পীর তাৎক্ষণিক উদ্ভাবনী ক্ষমতাকে প্রস্ফূটিত করে ।

কয়েকজন উল্লেখযোগ্য কর্নাটকী সংগীতশিল্পী হলেন - শ্যাম শাস্ত্র , মুথুস্বামী দীক্ষিতকর , এম এস শুভলক্ষ্মী , ডিকে পাট্টামাল , এম এল বসন্তকুমারী প্রমুখ ।

কর্নাটকী সংগীতের কয়েকটি রীতি নিম্নে উল্লেখ করা হল :-

( A ) গীতম ( Gitam ) :

  • এটি সবচেয়ে সহজ ধরনের রচনাশৈলী ।
  • সংগীত নবিশদের সংগীত তালিম দিতে গীতম ব্যবহার করা হয় ।
  • সংগীতের সুরেলা প্রবাহমানতা লক্ষ্য করা যায় ।

( B ) সুলাদি ( Suladi ) :

  • সংগীত নির্মাণের দিক দিয়ে এটি অনেকটা গীতমের মত ।
  • তবে এর সংগীতের বিন্যাস গীতমের চেয়ে উন্নততর ।

( C ) বর্ণম ( Varnam ) :

  • বাদ্যযন্ত্র কারু শিল্পের একটি সুন্দর সৃষ্টি হল এই সংগীত রীতিটি যাতে রাগের বিচিত্র বৈশিষ্ট্য প্রস্ফুটিত হয় ।
  • বর্ণম রীতি অনুশীলন একজন সংগীতজ্ঞকে সংগীত উপস্থাপনার দক্ষতা অর্জনে পারদর্শী করে তোলে ।

( D ) স্বরযতি ( Svarjati ) :

  • গীতম শিক্ষার পরে এটি শেখা উচিত ।
  • গীতম শিক্ষার চেয়েও এটি জটিল কারণ এটি বর্ণম শিক্ষার পথ প্রশস্ত করে ।
  • এর মূল ভিত্তি হয় ভক্তি , প্রেম বা বীরত্বমূলক ।

( E ) যতিস্বর ( Jatisvaram ) :

  • বাদ্য যন্ত্রের কাঠামোতে স্বরযতির সঙ্গে খুব সাদৃশ্য আছে তবে এতে সাহিত্য বা শব্দ থাকে না ।
  • এই অংশটি কেবলমাত্র ‘ সোলফা সিলেবলের সঙ্গে গাওয়া হয় ।

( F ) কীর্তনম ( Kirtanam ) :

  • চতুর্দশ শতকের শেষার্ধে - এর জন্ম হয়েছিল ।
  • এটি সাহিত্যের ভক্তিমূলক বিষয়বস্তুর জন্য মূল্যবান ।
  • এটি সমবেতভাবে উপস্থাপনার পাশাপাশি একক উপস্থাপনার জন্য ও উপযুক্ত ।

( G ) পদ :

  • বিশেষভাবে তামিল ও তেলুগু ভাষায় রচিত হয়েছে ।
  • সংগীত সাধারণত ধীরলয়ের এবং মর্যাদাপূর্ণ হয় ।
  • যদি এগুলি নৃত্যের রূপ হিসাবে রচিত হয় তবে সংগীতানুষ্ঠানে নান্দনিক আনন্দের জন্যও গাওয়া হয় ।

( H ) জাভালি ( Javali ) :

  • এগুলি হালকা শাস্ত্রীয় সংগীত পরিসরের অন্তর্গত রচনা ।
  • সংগীতানুষ্ঠান এবং নৃত্যানুষ্ঠান উভয়ক্ষেত্রেই পরিবেশিত হয় ।
  • এটি ঐশ্বরিক প্রেমকে বিকশিত বা চিত্রিত করে ।

( I ) তান ( Tanam ) :

  • মধ্যম লয়ে রাগ আলাপের একটি শাখা / অংশ ।
  • এর মধ্যে অনুধাবনযোগ্য ছন্দ রয়েছে ।
  • ছান্দিক প্রবাহমানতা , রাগ প্রকাশের চিত্তাকর্ষক অংশ শ্রোতাকে মন্ত্রমুগ্ধ করে দেয় ।

হিন্দুস্থানি ও কর্নাটকী সংগীতের প্রধান পার্থক্য সমূহ :

পার্থক্যের পয়েন্ট হিন্দুস্থানি সংগীত কর্নাটকী সংগীত
প্রভাব আরব , পারস্য এবং আফগান স্বদেশীয় / সহজাত
স্বাধীনতা সংগীতে বৈচিত্র্য নিয়ে আসার ক্ষেত্রে শিল্পীর স্বাধীনতা রয়েছে সংগীত উন্নত / বৈচিত্র্যময় করার স্বাধীনতা লক্ষ্য করা যায় না
উপশৈলী এখানে অনেক উপশৈলী বা ঘরানা লক্ষ্য করা যায় এখানে সহজাত বা একক শৈলীতে পরিবেশন করতে হয়
বাদ্যযন্ত্র কণ্ঠের পাশাপাশি বাদ্যযন্ত্রের উপযোগিতা সমানভাবে প্রয়োজন এখানে কণ্ঠের স্বকীয়তা অধিক গুরুত্ব পায়
রাগ ৬টি প্রধান রাগ লক্ষ্য করা যায় ৭২ টি রাগের প্রকাশ লক্ষ্যণীয়
প্রধান প্রধান বাদ্যযন্ত্র তবলা , সারেন্সি , সেতার , সন্তুর প্রভৃতি বীণা , মৃদঙ্গম , মান্দোলিন প্রভৃতি
প্রচলিত অঞ্চল উত্তর ভারত বিশেষত দক্ষিণ ভারত
উভয়ের সাদৃশ্য বাঁশি এবং বেহালার ব্যবহার বাঁশি এবং বেহালার ব্যবহার

Thanks for your comment. We review and answer your comment.

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post