আগ্নেয় শিলা (Igneous Rock)

সংজ্ঞা : উত্তপ্ত তরল অবস্থা থেকে তাপ বিকিরণের ফলে শীতল ও কঠিন হওয়ার সময়ে ভূ - ত্বক ও ভূ - আভ্যন্তরের বিভিন্ন উপাদান জমাট বেঁধে কঠিন হয়ে যে শিলার সৃষ্টি করে , তাকে আগ্নেয় শিলা ( Igneous Rocks ) বলে ।

উত্তপ্ত পদার্থ বা ম্যাগমা জমাট বেঁধে সৃষ্টি হওয়ায় এই শিলাকে আগ্নেয় শিলা বলা হয় ( Igneous Rocks : ল্যাটিন শব্দ 'Ignis'- এর অর্থ হল 'অগ্নি' ) । আগ্নেয় শিলা অন্য কোন শিলা থেকে গঠিত হয়নি , তাই একে প্রাথমিক শিলাও বলে । আগ্নেয় শিলার মধ্যে কোন স্তর থাকে না , তাই আগ্নেয় শিলাকে অ-স্তরীভূত শিলাও বলে । ভূত্বকের প্রায় ৮০ % অংশ আগ্নেয় শিলায় গঠিত ।

উদাহরণ : ব্যাসল্ট , গ্রানাইট , ডোলেরাইট প্রভৃতি পাথর আগ্নেয় শিলার উদাহরণ ।

আগ্নেয় শিলার শ্রেণী বিভাগ :

আগ্নেয় শিলাকে মোটামুটি প্রধান ২ টি ভাগে ভাগ করা যায় , যথা : ( ১ ) নিঃসারী আগ্নেয় শিলা ও ( ২ ) উদবেধী আগ্নেয়শিলা । নিঃসারী আগ্নেয়শিলাকে আবার দু'ভাগে ভাগ করা যায় , যথা : ( ক ) লাভা শিলা ও ( খ ) পাইরোক্লাসটিক শিলা । উদ্‌বেধী আগ্নেয়শিলাকেও দু'ভাগে ভাগ করা যায় , যথা : ( ক ) পাতালিক শিলা ও ( খ ) উপপাতালিক শিলা ।

আগ্নেয় শিলার বৈশিষ্ট্য :

( ১ ) আগ্নেয় শিলার মধ্যে কোন স্তর নেই ;
( ২ ) আগ্নেয় শিলার মধ্যে জীবাশ্ম দেখা যায় না ;
( ৩ ) পৃথিবী গঠনকারী বিভিন্ন মৌলিক পদার্থ মিলেমিশে ঘন সংবদ্ধভাবে দানা বেঁধে আগ্নেয়শিলা শিলা গঠন করেছে ;
( ৪ ) এই শিলা পাললিক ও রূপান্তরিত শিলার চেয়ে তুলনামূলক ভাবে ভারী ;
( ৫ ) প্রকৃতিতে এই শিল্পা অত্যন্ত কঠিন বলে সহজে ক্ষয়প্রাপ্ত হয় না ;
( ৬ ) সময়ে সময়ে এই শিলাকে দেখতে স্ফটিকাকার বা কাঁচের মত হয় ।

**ভারতবর্ষের দাক্ষিণাত্যের মালভূমি অঞ্চল আগ্নেয় শিলা দ্বারা গঠিত ।

ম্যাগমা : ম্যাগমা হল বিভিন্ন রকমের উত্তপ্ত তরল শিলার মিশ্রণ , যা কোন ফাটল বা ছিদ্রপথ দিয়ে ভূ - ত্বকের ওপর বা নীচে সঞ্চিত হয় । প্রথম অবস্থায় ম্যাগমার মধ্যে বিভিন্ন রকমের গ্যাস ও জলীয় বাষ্প থাকে । কিন্তু ম্যাগমা যখন ফাটল বা ছিদ্র পথে ভূপৃষ্ঠের ওপর উঠে আসে তখন তার মধ্যে থেকে গ্যাস ও জলীয় বাষ্প বেরিয়ে যায় এবং তখন ম্যাগমাকে লাভা বলে । ম্যাগমা ধীরে ধীরে তাপ বিকিরণ করে শীতল হয় এবং আগ্নেয় শিলা সৃষ্টি করে । ভূ - ত্বকের নীচে অবস্থিত গুরুতল বা ম্যান্টল হল ম্যাগমার উৎস স্থল ।

আগ্নেয় শিলা (Igneous Rock)
আগ্নেয় শিলা (Igneous Rock)


উৎপত্তি অনুসারে আগ্নেয় শিলার শ্রেণীবিভাগ :

আগ্নেয় শিলার শ্রেণীবিভাগ : সৃষ্টির বিভিন্নতা অনুসারে আগ্নেয় শিলাকে মোটামুটি দুটি ভাগে ভাগ করা যায় , যথা : ( ক ) নিঃসারী ও ( খ ) উদবেধী আগ্নেয় শিলা ।

( ক ) নিঃসারী আগ্নেয় শিলা ( Extrusive or Volcanic Rock ) :

ভূ - গর্ভের উত্তপ্ত গলিত পদার্থ বা ম্যাগমা অগ্ন্যুৎপাতের সময় আগ্নেয়গিরির মুখ দিয়ে ভূ - পৃষ্ঠের ওপর লাভারূপে প্রবাহিত হবার সময় ঠাণ্ডা বাতাসের সংস্পর্শে এসে শীতল ও কঠিন হয়ে যে আগ্নেয় শিলার সৃষ্টি করে তাকে নিঃসারী আগ্নেয় শিলা বলে । দ্রুত জমে যাওয়ায় এই শিলার কণাগুলি খুবই সূক্ষ্ম থাকে ।

নিঃসারী আগ্নেয় শিলার বৈশিষ্ট্য : ( ১ ) নিঃসারী আগ্নেয় শিলার আপেক্ষিক ঘনত্ব বেশী হয় ; ( ২ ) দ্রুত জমাট বাধার ফলে নিঃসারী আগ্নেয়শিলার দানাগুলো খুব সুক্ষ্ম হয় ; ( ৩ ) নিঃসারী আগ্নেয় শিলার রঙ খুব গাঢ় হয় ।

নিঃসারী আগ্নেয় শিলার উদাহরণ : ব্যাসন্ট ( Basalt ) একটি নিঃসারী আগ্নেয় শিলা । ট্রাম লাইন বা রেল লাইনের ধারে যে কালো রঙের পাথর দেখতে পাওয়া যায় , তাই হল ব্যাসল্ট শিলা । পশ্চিমবঙ্গের রাজমহলের পাহাড়গুলি ব্যাসন্ট শিলায় তৈরী । ব্যাসন্ট শিলা দিয়ে গঠিত পাহাড়ের চূড়াগুলো চ্যাপ্টা মত দেখতে হয় । ক্ষয়প্রাপ্ত ব্যাসন্ট শিলায় সিড়ির মত ধাপ দেখতে পাওয়া যায় , একে ট্রাপ বলে ।

নিঃসারী আগ্নেয় শিলার শ্রেণীবিভাগ : উৎপত্তি অনুসারে নিঃসারী আগ্নেয় শিলাকে দু'ভাগে ভাগ করা যায় : ( ১ ) লাভা শিলা (Lava Rock) এবং ( ২ ) পাইরোক্লাসটিক শিলা (Pyroclastic Rock) ।

( ১ ) লাভা শিলা : আগ্নেয়গিরির লাভা ঠাণ্ডা হয়ে ও জমাট বেঁধে যে শিলার সৃষ্টি হয় তাকে লাভা শিলা বলে । বেশীরভাগ নিঃসারী শিলা এই জাতীয় লাভা শিলা ( উদাহরণ : ব্যাসন্ট ) ।

( ২ ) পাইরোক্লাসটিক শিলা : আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের সময় নির্গত এবং আগে থেকে জমে কঠিন হয়ে আসা লাভা , ডস্ম প্রভৃতি ছোট ছোট শিলাখণ্ডকে পাইরোক্লাসটিক শিলা বলে । উদাহরণ : টাফ ( Tuff ) শিলা ।

( খ ) উদ্‌বেধী আগ্নেয় শিলা ( Intrusive Rock ) :

ভূ - গর্ভের উত্তপ্ত গলিত পদার্থ বা ম্যাগমা অনেক সময় ভূ - পৃষ্ঠে পৌঁছুতে না পেরে ভূ - গর্ভের ভেতরেই বহু বছর ধরে ধীরে ধীরে জমে শীতল হয়ে কঠিন শিলায় পরিণত হয় , এই শিলাকে উদ্‌বেধী আগ্নেয় শিলা বলে ।

উদবেধী আগ্নেয় শিলার বৈশিষ্ট্য : ( ১ ) উদ্‌বেধী শিলার আপেক্ষিক ঘনত্ব নিঃসারী শিলার তুলনায় কম হয় ; ( ২ ) ধীর গতিতে জমাট বাঁধার ফলে উদ্‌বেধী আগ্নেয়শিলার দানাগুলো নিঃসারী শিলার তুলনায় স্থুল হয় । ( ৩ ) উদ্‌বেধী আগ্নেয় শিলার রঙ হালকা হয় ।

উদ্‌বেধী শিলার শ্রেণীবিভাগ : উদ্‌বেধী শিলা আবার দু'ধরনের হয় , যথা- ( ১ ) পাতালিক এবং ( ২ ) উপপাতালিক উদ্‌বেধী শিলা ।

( ১ ) পাতালিক শিলা : উত্তপ্ত গলিত পদার্থ ভূ - পৃষ্ঠের অনেকটা নিচের দিকে অতি ধীরে ধীরে বহু বছর ধরে শীতল , কেলাসিত ও কঠিন হলে তাকে পাতালিক শিলা বলে । ধীরে ধীরে শীতল হওয়ায় এই শিলার কণাগুলি বড় বড় হয় । গ্রানাইট উদবেধী পাতালিক শিলার উদাহরণ । সাধারণত অভ্র , কোয়ার্টজ , ফেলসপার প্রভৃতি খনিজ পদার্থ দিয়ে গ্রানাইট শিলা গঠিত হয় । এই শিলা দিয়ে গঠিত পাহাড়ের চূড়াগুলো গোলাকার হয় । দাক্ষিণাত্য মালভূমি , ছোটনাগপুর প্রভৃতি অঞ্চলে গ্রানাইট শিলা দেখা যায় । প্রকৃতিতে খুবই শক্ত হওয়ায় রাস্তাঘাট প্রভৃতি নির্মাণে গ্রানাইট পাথর ব্যবহার করা হয় ।

( ২ ) উপপাতালিক শিলা : উত্তপ্ত গলিত পদার্থ ভূ - পৃষ্ঠে পৌঁছুতে না পেরে ভূ - ত্বকের অল্প নীচে বা ভূ - ত্বকের ফাটলের মধ্যেই শীতল এবং কঠিন হয়ে শিলায় পরিণত হলে তাকে উপপাতালিক শিলা বলে । উপপাতালিক শিলা পাতালিক শিলার তুলনায় দ্রুত জমাট বাঁধে । উদাহরণ : ডোলেরাইট এবং পরফাইরি এই শিলার উদাহরণ ।

রাসায়নিক গঠন অনুসারে আগ্নেয় শিলার শ্রেণীবিভাগ :

রাসায়নিক গঠন অনুসারে আগ্নেয় শিলাকে চার ভাগে ভাগ করা হয় , যথা :

( ১ ) অম্লিক শিলা বা অ্যাসিডিক রক ( Acidic rock ) : এই জাতীয় শিলার মধ্যে ক্ষারকীয় অক্সাইডের পরিমাণ হয় খুব কম এবং সিলিকা বা বালির পরিমাণ থাকে বেশ বেশী ( ৬৫ % ) ; উদাহরণ : গ্রানাইট শিলা ।

( ২ ) মধ্যবর্তী শিলা বা ইন্টারমিডিয়েট রক ( Intermidiate Rock ) : এই জাতীয় শিলার মধ্যে ক্ষারকীয় অক্সাইড এবং সিলিকা দুইয়ের পরিমাণই কম থাকে ; উদাহরণ : ডাইওরাইট ।

( ৩ ) ক্ষারকীয় শিলা বা বেসিক রক ( Basic Rock ) : এই জাতীয় শিলার মধ্যে সোডিয়াম , পটাসিয়াম , ম্যাগনেসিয়াম , অ্যালুমিনিয়াম প্রভৃতি ক্ষারকীয় অক্সাইডের পরিমাণ থাকে বেশী ( ৪৫ % ) ; উদাহরণ : ব্যাসল্ট ।

( ৪ ) অতি ক্ষারকীয় শিলা বা আলট্রা বেসিক রক ( Ultra Basic Rock ) : এই জাতীয় শিলার মধ্যে ক্ষারকীয় অক্সাইডের পরিমাণ বেশ বেশী ( ৫৫ % ) ; উদাহরণ : পেরিডোটাইট ।

Thanks for your comment. We review and answer your comment.

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post