অর্থনীতির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক সম্পর্কে ধারণা

অর্থনীতির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক সম্পর্কে ধারণা

১. ভোক্তা মূল্যসূচক ( কনজিউমার প্রাইস ইনডেক্স ) : এই সূচক নির্ধারণ করা হয় একটি সমপ্রকৃতিসম্পন্ন গোষ্ঠীর ( যেমন : শিল্পক্ষেত্রে শ্রমিক ) ভোগের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি ও সেবাকার্যের খুচরো মূল্যের পরিবর্তনের ভিত্তিতে । এই সূচকের মাধ্যমে মুদ্রাস্ফীতির পরিমাপ করা হয় ।

২. পাইকারি মূল্যসূচক ( হোলসেল প্রাইস ইনডেক্স ) : পাইকারি মূল্যসূচক নির্ধারিত হয় দেশের সমস্ত দ্রব্য এবং সমস্ত দ্রব্যের মূল ও উপগোষ্ঠীর মূল্যস্তরের গতিবিধির পরিবর্তনশীলতার ভিত্তিতে । এই পাইকারি মূল্যসূচক প্রতি সপ্তাহের মূল্যস্তর বৃদ্ধির গতিবিধি পরিমাপ করে । সুতরাং , এই পাইকারি মূল্যসূচকের মাধ্যমে দেশের মূল্যস্তরের পরিবর্তনশীলতার ধারাবাহিকতা পর্যালোচনা করা হয় । তবে , যাইহোক , এই সূচক কখনোই সেবাক্ষেত্রের মূল্যবৃদ্ধি সূচিত করে না , শুধুমাত্র দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি সুচিত করে ।

৩. মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বিচ্যুতি ( জিডিপি ডিফ্লেক্টর ) : ভাষাগতভাবে , এটিকে কোনো সূচক বলে মনে না হলেও কার্যতভাবে এটি দেশের মুদ্রাস্ফীতির হ্রাস বৃদ্ধিকে সূচিত করে । প্রকৃতপক্ষে , মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বিচ্যুতি হল চলতি বছরের মূল্যস্তরে মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ও ভিত্তি বছরের মূল্যস্তরে মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের অনুপাত ।

৪. মানব উন্নয়ন সূচক ( হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট ইনডেক্স ) :

অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিমাপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক নির্দেশক হল মানব উন্নয়ন সূচক বা এইচডিআই । ১৯৯০ সাল থেকে রাষ্ট্রসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচিতে জনসাধারণের সামগ্রিক উন্নয়ন পরিমাপ করার জন্য মানব উন্নয়ন সূচক ব্যবহার করা হয় । পাকিস্তানের অর্থনীতিবিদ মেহেবুব - উল হক - এর নেতৃত্বে এই সূচক গঠন করা হয় । এই সূচকের মান ০ থেকে ১ এর মধ্যে হয়ে থাকে । যে দেশের মানব উন্নয়ন সূচক যত ১ এর কাছাকাছি সে দেশের মানব উন্নয়ন তত বেশি এবং যে দেশের মানব উন্নয়ন সূচক যত ০ এর কাছাকাছি সে দেশের মানব উন্নয়ন তত কম ।

মানব উন্নয়ন সূচকের নির্দেশক :

( a ) প্রত্যাশিত আয়ু : আয়ুর দৈর্ঘ্য পরিমাপ করা হয় জন্মের সময় আয়ু প্রত্যাশার দ্বারা ।
( b ) শিক্ষাগত যোগ্যতা অর্জন : শিক্ষা প্রসারে সাফল্যকে দুই ভাগে ভাগ করা হয় । এক ভাগে রয়েছে প্রাপ্ত বয়স্কদের স্বাক্ষরতার হার আর অন্যভাগে রয়েছে প্রাথমিক , মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা ক্ষেত্রে ভর্তির হার ।
( c ) মাথাপিছু স্থূল অন্তর্দেশীয় আয় : এক্ষেত্রে আয় পরিমাপ করা হয় । ডলারের অঙ্কে ক্রয়ক্ষমতার সমতার ভিত্তিতে ।

মানব উন্নয়ন সূচকের নিরিখে দেশের শ্রেণিবিভাগ :
>০.৮ উন্নয়নের উচ্চতম স্তর
০.৫-০.৮ উন্নয়নের মধ্যম স্তর
<০.৫ উন্নয়নের নিম্নতম স্তর

সাম্প্রতিক প্রকাশিত মানব উন্নয়ন সূচক অনুযায়ী ১৮৯ টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান ১৩১ ( ভ্যালু : ০.৬৪৫ ) । শীর্ষে রয়েছে নরওয়ে ( ভাগ : ০.৯৫৭ ) ।

২০০১ সালে ভারতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়ির তত্ত্বাবধানে ভারতীয় রাজ্যগুলির জন্য প্রথম মানব উন্নয়ন সূচক তৈরি করা হয় যা পরিকল্পনা কমিশন দ্বারা প্রকাশিত হয় ২০০২ সালে । তবে বর্তমানে মানব উন্নয়ন সূচক রিপোর্টটি প্রকাশের দায়িত্বে রয়েছে নীতি আয়োগ । জাতীয় স্তরের পাশাপাশি রাজ্যস্তরেও জেলাগুলির মানব উন্নয়ন সূচক নির্ধারণ করা হয় ।

৫. লিঙ্গ ভিত্তিক উন্নয়ন সূচক ( জেন্ডার ডেভেলপমেন্ট ইনডেক্স ) : বিশ্বের বিভিন্ন দেশে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য অনুসন্ধান করার জন্য UNDP ১৯৯৫ সালে প্রথম জিডিআই রিপোর্ট প্রকাশ করে ।

৬. লিঙ্গ বৈষম্য সূচক ( জেন্ডার ইনিকুয়ালিটি ইনডেক্স ) : লিঙ্গ ভিত্তিক উন্নয়ন সূচকের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশে নারী পুরুষের বৈষম্য অনুধাবনের জন্য ২০১০ সালে প্রথম GII রিপোর্ট প্রকাশ করে UNDP । সাম্প্রতিক লিঙ্গ বৈষম্য সূচক অনুযায়ী ভারতের স্থান ১২৩ ( ভ্যালু ০.০৮৮ ) । এক্ষেত্রে সুইৎজারল্যান্ড শীর্ষে রয়েছে ( ভ্যালু ০.০২৫ ) ।

৭. মানব স্ববহনক্ষম উন্নয়ন সূচক ( হিউম্যান সাস্টেনেবল ডেভেলপমেন্ট ইনডেক্স ) : এই সূচকটির উদ্ভাবন ঘটেছে ২০১০ সালে । এই সূচকের মাধ্যমে সার্বিকভাবে মানুষের জীবনধারণের মান নির্ধারণ করা হয় , যেখানে পূর্বতন মানব উন্নয়ন সূচকের সঙ্গে মাথাপিছু কার্বন নির্গমণের বিষয়টিকে গণ্য করা হয় । অর্থাৎ , মানব উন্নয়ন সূচকটিকে পরিমাপ করা হয় সবুজ অর্থনীতির দৃষ্টিভঙ্গিতে ।

৮. সেনসেক্স : বোম্বে স্টক এক্সচেঞ্জের গুরুত্বপূর্ণ ৩০ টি কোম্পানির স্টক মার্কেটের মূল্য সূচক ।

৯. নিফটি : ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জের গুরুত্বপূর্ণ ৫০ টি কোম্পানির স্টক মার্কেটের মূল্য সূচক ।

১০. ডোলেক্স -৩০ : এটি সেনসেক্স সূচকের ডলার ভার্সন ।

১১. রেসিডেক্স : শহরাঞ্চলের বিশেষ বিশেষ জায়গায় বসবাসের উপযোগী এলাকার জমির মূল্য বৃদ্ধির সূচক বিশেষ ।

১২. বহুমাত্রিক দারিদ্র সূচক ( মাল্টি ডিমেনশনাল পভাটি ইনডেক্স ) : ২০১০ সালে এই ধারণাটির উদ্ভাবন করে অক্সফোর্ড পভাটি অ্যান্ড হিউমান ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ এবং ইউএনডিপি । তার আগে মানব দারিদ্য সূচক ব্যবহৃত হত । এই সূচকটি পরিমাপ করা হয় নিমোক্ত সমীকরণটির মাধ্যমে :

MPI = H * A ;
যেখানে H হল গরিব লোকেদের শতাংশ এবং A হল MPI দারিদ্রের শতাংশের গড় প্রবণতা ।
এই বহুমাত্রিক দারিদ্র্য সূচকের মূল তিনটি মাত্রা হল— শিক্ষা , স্বাস্থ্য ও জীবন ধারণের মানসমূহ । তবে এই তিনটি মাত্রার মোট ১০ টি সূচক আছে -
স্বাস্থ্য সংক্রান্ত মাত্রাটির মূল সূচকগুলি হল— ● শিশু মৃত্যু ● পুষ্টি
শিক্ষা সংক্রান্ত মাত্রাটির মূল সূচকগুলি হল— ● ইয়ার্স অফ স্ফুলিং ● চিলড্রেন এনরোলমেন্ট
জীবন ধারণের মানের সূচকগুলি হল— ● রান্নার গ্যাস ● পানীয় জল ● বিদ্যুৎ ● গৃহতল ● সম্পদ
বহুমাত্রিক দারিদ্র্য সূচকের মান ০ থেকে ১ এর মধ্যে ধার্য হয় । সাম্প্রতিক বহুমাত্রিক নারিদ্র্য সূচক অনুযায়ী ভারতের স্থান ৬২ ।

১৩. বিশ্ব ক্ষুধা সূচক ( গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্স ) : বিশ্বব্যাপী , দেশব্যাপী বা অঞ্চলব্যাপী ক্ষুধা পরিমাপ করার উদ্দেশ্যে এই সূচকটি চিত্রিত হয়েছে । আন্তর্জাতিক খাদ্যনীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান এই সুচকটি হিসেব করে প্রতি বছর । তিনটি সমভার সম্পন্ন সূচকের সমন্বয়ে এটি গঠিত । যেমন :

অপুষ্টিজনিত সূচক : এক্ষেত্রে মোট জনসংখ্যার যত শতাংশ অপুষ্টিজনিত সমস্যার সম্মুখীন হয় তাকেই সুচিত করা হয় ।
কম ওজন সংক্রান্ত শিশুদের সমস্যা জনিত সূচক : এক্ষেত্রে পাঁচ বছরের নিচে মোট শিশুদের কত শতাংশ কম ওজন সম্বলিত সেটিকে সূচিত করে ।
শিশুমৃত্যু হার সংক্রান্ত সূচক : এক্ষেত্রে শিশুমৃত্যুর হারকে সুচিত করা হয় ।
বিশ্ব ক্ষুধা সূচকের মান ০ থেকে ১০০ পর্যন্ত ধরা হয় । বিশ্ব ক্ষুধা সূচক ২০২১ অনুযায়ী ১১৬ টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান ১০১ ।

Thanks for your comment. We review and answer your comment.

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post