বিভিন্ন মতবাদ সংক্রান্ত তথ্যাবলী (Information on various doctrines)

বিভিন্ন মতবাদ সংক্রান্ত তথ্যাবলী

নব্য ঔপনিবেশিকতাবাদ (Neo-colonialism)

মূল অর্থ : — পুঁজিবাদ , সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদ ও বিশ্বায়নকে ব্যবহার করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর উপর প্রভাব বিস্তারের নতুন কৌশল হল নব্য ঔপনিবেশিকতাবাদ । পূর্ববর্তী ঔপনিবেশিক পদ্ধতিগুলোর মতো এই ব্যবস্থায় প্রত্যক্ষ সামরিক নিয়ন্ত্রণ কিংবা অপ্রত্যক্ষ রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন পড়ে না । ১৯৫৬ সালে ফরাসি দার্শনিক জ্যাঁ - পল সাঁত্রে এই শব্দটির উল্লেখ করলেও কোয়াম এনক্রমাহ এটি প্রথম ব্যবহার করেন ।

নব্য ঔপনিবেশিকতাবাদের উত্থান : - প্রথম দিকে নব্য ঔপনিবেশবাদ ইউরোপীয় দেশগুলির সাথে তাদের পূর্ববর্তী উপনিবেশগুলির বিশেষত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে স্বাধীন হওয়া আফ্রিকার দেশগুলি অব্যাহত অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ককে আলোচনায় নিয়ে আসে । ' নব্য ঔপনিবেশিকতাবাদ ' শব্দটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিদেশি রাষ্ট্রের উপর প্রাক্তন উপনিবেশগুলির নির্ভরতাকে বোঝাতে ব্যবহার করা হয় । ট্রুম্যানের মতে , ঠাণ্ডা লড়াইয়ের ফলস্বরূপ নব্য ঔপনিবেশিকতাবাদে উত্থান হয়েছিল । সাম্যবাদ থেকে সুরক্ষা পেতে - অন্যান্য দেশ বা উপনিবেশিক দেশগুলির উপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মোটা অঙ্কের টাকা অর্পনের পথ দেখিয়েছিল । সমালোচকরা যুক্তি দেখিয়েছেন যে নব্য ঔপনিবেশিকতাবাদের মাধ্যমে পুঁজিবাদী দেশগুলি উন্নয়নকামী দেশের বহুজাতিক সংস্থায় বিনিয়োগের মাধ্যমে সেদেশের পরিচালন ক্ষমতা কিছুটা হলেও নিজেদের কুক্ষিগত রাখার চেষ্টা করে । সর্বোপরি একথা বলা যায় , উন্নয়নকামী দেশগুলির স্বল্পন্নোত অংশগুলির উন্নয়নের চেয়ে আরো অধিকতর শোষণের পথ প্রশস্ত করে পুঁজিবাদী দেশগুলো । নুতুন এই ব্যবস্থার অধীনে বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেলেও ধনী ও দরিদ্র দেশগুলোর মাঝে ব্যবধান আরো বৃদ্ধি পায় ।

নব্য ঔপনিবেশিকতাবাদের সত্যতা : - কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন নব্য ঔপনিবেশিকতাবাদের অস্তিত্ব ও সত্যতা নিয়ে । এক্ষেত্রে অবশ্যই বলা যায় নব্য ঔপনিবেশিকতাবাদের সত্যতা রয়েছে । এটি বিশ্বব্যাপী আর্থিক বৃদ্ধির বৈষম্য , অর্থনৈতিক শোষণের মাত্রাকে ত্বরান্বিত করে । বর্তমানে আফ্রিকান দেশগুলোর উপর ভারতীয় এবং চীনা প্রভাব প্রতিস্থাপনের প্রচেষ্টা নব্য - ঔপনিবেশিকতাবাদের পূর্ব সংস্করণ হিসাবে গণ্য ।

নব্য সাম্রাজ্যবাদ (Neo-imperialism)

নব্য সাম্রাজ্যবাদের সাম্রাজ্যবাদী সম্প্রসারণ জোরালো হয়েছিল ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধ্ব থেকে , ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রাক সময় পর্যন্ত । তবে একথা বলা যায় ১৮৭০ সালের পর নব্য সাম্রাজ্যবাদের সম্প্রসারণ শুরু হয়েছিল ।

কারণ : — মুক্ত বাণিজ্যের আওতায় দ্রুত আর্থিক বৃদ্ধির পর শিল্পোন্নত বিশ্বে ১৮৭৩ সাল নাগাদ এক আর্থিক সংকট দেখা দিয়েছিল । আর্থিক ও সামাজিক সংকটে জর্জরিত রাষ্ট্রগুলি এই সংকটের জবাবে রাষ্ট্রগুলো আর্থিক সম্পর্ক পরিচালনায় আরও সক্রিয় পদ্ধতি গ্রহণ করেছিল । যার ফল হল নব্য সাম্রাজ্যবাদের উত্থান ।

নব্য সাম্রাজ্যবাদের প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্য : —

( ১ ) এটি অর্থনৈতিক উদ্দেশ্যে চালিত হয় যার প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করেছে ইউরোপীয় শক্তি , জাপান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র । নব্য সাম্রাজ্যবাদের উত্থানের সাথে সাথে আফ্রিকা এবং এশিয়ায় অনেক ছোট ছোট সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ।
( ২ ) এর একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হল প্রযুক্তিগত উন্নতিকে কাজে লাগিয়ে সাম্রাজ্য প্রতিস্থাপনের পথ প্রশস্ত করা । রেলপথের সম্প্রসারণ , স্টিমবোর্টের ব্যবহার , পরিবহণ ব্যবস্থার দ্রুত উন্নতি , যোগাযোগের উদ্দেশ্যে টেলিগ্রাফের ব্যবহার , সামরিক উদ্দেশ্যে মেশিনগানের ব্যবহার , এমনকী চিকিৎসার জন্য ভ্যাকসিন তৈরি তারই সুযোগ্য ফল ।
( ৩ ) নব্য সাম্রাজ্যবাদের অধীনে রাষ্ট্র , ছোট ছোট ঔপনিবেশিক এলাকাভিত্তিক শাসন কার্য পরিচালনা করত ।
( ৪ ) এই রীতিতে জাতিগত সংহতি নষ্ট হয় ।
( ৫ ) নব্য সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলি চেয়েছিল ঔপনিবেশিক দেশগুলি থেকে মূল্যবান ধাতু , উদ্ভিজ তেল , রঞ্জক প্রভৃতি নিজেদের অধিকারে নিয়ে আসতে । উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় নেদারল্যান্ড থেকে বিপুল মানুষ এই উপনিবেশিক শোষণের আধিপত্য কার্যকরী করতে দক্ষিণ আফ্রিকায় বসতি স্থাপন করেছিল ।

পুঁজিবাদ (Capitalism)

১৫ শতকের ইউরোপীয় সমাজ ব্যবস্থায় যে নতুন ধারার উদ্ভব হয়েছিল তার নাম হল পুঁজিবাদ ( Capitalism ) । পুঁজিবাদ হল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যা ব্যক্তিগত মালিকানা , উৎপাদনের উপায়ের নিয়ন্ত্রণ এবং লাভের জন্য তাদের পরিচালনার উপর ভিত্তি করে নিয়ন্ত্রিত ।

পুঁজিবাদের কেন্দ্রীয় বিষয়গুলির মধ্যে রয়েছে- পুঁজি সংগ্রহ , প্রতিযোগিতামূলক বাজার , সরবরাহ এবং চাহিদা দ্বারা নির্ধারিত একটি মূল্য ব্যবস্থা । ব্যক্তিগত সম্পত্তি , সম্পত্তি অধিকারের স্বীকৃতি , স্বেচ্ছাশ্রম বিনিময় , মজুরি শ্রম , পুঁজিবাদী বাজার অর্থনীতিতে , সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং বিনিয়োগ , সম্পদ , সম্পত্তি , পুঁজি চালনা করার ক্ষমতা বা পুঁজিবাজার ও আর্থিক বাজারে উৎপাদন ক্ষমতার মালিকদের দ্বারা নির্ধারিত হয় , যেখানে মূল্য এবং পণ্য ও পরিষেবার বণ্টন প্রধানত পণ্যের এবং সেবার বাজারের প্রতিযোগিতার দ্বারা নির্ধারিত হয় ।

পুঁজিবাদের প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ :

  • পুঁজি সঞ্চয়ন ।
  • পণ্য উৎপাদন ।
  • উৎপাদনের উপায়ে ব্যক্তিগত মালিকানা ।
  • উচ্চস্তরের মজুরি শ্রম ।
  • অর্থ বিনিয়োগ করে লাভবান হওয়া যায় ।
  • পুঁজিপতিরা ব্যবসা ও বিনিয়োগ পরিচালনার জন্য স্ব - স্বার্থে কাজ করার স্বাধীনতা ।

পুঁজিবাদের প্রকারভেদ :

দেশ ও অঞ্চল অনুসারে অনেকগুলো প্রকারের পুঁজিবাদ লক্ষ্য করা যায় , যথা—

( a ) উন্নত পুঁজিবাদ : - উন্নত পুঁজিবাদ হল এমন পর্যায় যা একটি সমাজের সাথে সম্পর্কিত যেখানে পুঁজিবাদী মডেলটি দীর্ঘ সময়ের জন্য গভীরভাবে একত্রিত ও বিকশিত হয়েছে । জার্গেন হ্যাবারমাস এই রীতির একজন প্রধান বিশ্লেষক ।

( b ) কর্পোরেট পুঁজিবাদ : - এটি হল একটি মুক্ত বা মিশ্রবাজার পুঁজিবাদী অর্থনীতি যা শ্রেণিবদ্ধ , আমলাতান্ত্রিক কর্পোরেশনগুলির আধিপত্য দ্বারা পরিচালিত হয় ।

( c ) আর্থিক পুঁজিবাদ : - এটি হল আর্থিক ব্যবস্থায় মুনাফা সঞ্চয় করার জন্য উৎপাদন প্রক্রিয়াগুলোর অধীনতা স্বীকার করা । মার্কসবাদ ও লেলিনবাদ এই রীতির পথিক ।

( d ) ব্যবসায়িক পুঁজিবাদ : - মার্কেন্টাইলিজম হল প্রারম্ভিক পুঁজিবাদের একটি জাতিয়তাবাদী রূপ যা প্রায় ১৬ শতকের শেষের দিকে প্রকট হয়েছিল । এটি রাষ্ট্র স্বার্থ এবং সাম্রাজ্যবাদের সাথে জাতীয় ব্যবসায়িক স্বার্থের মিশ্রিত রূপ দ্বারা চিহ্নিত হয় ।

( e ) সামাজিক পুঁজিবাদ : - সামাজিক বাজার অর্থনীতি হল মুক্ত বাজার বা মিশ্র বাজার পুঁজিবাদী ব্যবস্থা যেটিকে কখনো কখনো সমন্বিত অর্থনীতি হিসাবে শ্রেণীবদ্ধ করা হয় , যেখানে মূল্য নির্ধারণে সরকারি হস্তক্ষেপ লঘিষ্ঠ রাখা হয় , কিন্তু সামাজিক নিরাপত্তা , স্বাস্থ্য প্রভৃতি ক্ষেত্রে রাষ্ট্র গরিষ্ঠ ভূমিকা পালন করে ।

( f ) রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ : - রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ হল একটি পুঁজিবাদী বাজার অর্থনীতি যা রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন উদ্যোগ দ্বারা প্রভাবিত ও পরিচালিত হয় ।

( g ) টেকসই পুঁজিবাদ : - এটি হল পুঁজিবাদের এক ধারণাগত রূপ যা টেকসই অনুশীলনের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে যা বাহ্যিকতা হ্রাস করে এবং পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক নীতির সাদৃশ্য বহণ করে ।

সমাজের উপর প্রভাব :

পুঁজিবাদে দু'ধরনের প্রভাব সমাজের উপর লক্ষ্য করা গেছে । যথা— ইতিবাচক প্রভাব এবং নেতিবাচক প্রভাব ।

ইতিবাচক প্রভাবগুলো হল -
  • মধ্যবিত্তের উত্থানে যে সুপ্ত প্রতিভা ছিল তা থেকে ধনী হতে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে ।
  • দারিদ্র্যের আনুপাতিক হার কমিয়ে উদ্ভাবনী ও উদ্যোক্তা হওয়ার প্রচার করা ।
  • উপভোক্তাদের পছন্দসই পণ্য কেনার স্বাধীনতা বৃদ্ধি ।
  • সমাজের আর্থিক নিয়ন্ত্রণের উপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ হ্রাস পায় ।
নেতিবাচক প্রভাবগুলো হল -
  • এটি সহজাতভাবে শোষণমূলক , একচেটিয়া আর্থিক উত্থানের ফলে ধনী - দরিদ্রের বৈষম্য আরো প্রকট হয় ।
  • বিশ্বায়নের প্রভাব দ্বারা চালিত হয়ে সমাজের সনাতন পদ্ধতির অবক্ষয় সূচিত হয়েছিল ।
  • মানবাধিকারের অবক্ষয় , সাম্রাজ্যবাদী সম্প্রসারণ ও পরিবেশের অবনতি ঘটেছিল ।

সমাজতন্ত্রবাদ (Socialism)

সমাজতন্ত্রবাদ বা সমাজবাদ হচ্ছে এমন একটি সামাজিক এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে উৎপাদনের উপকরণের সামাজিক মালিকানা এবং অর্থনীতির এক সমবায়ভিত্তিক ব্যবস্থা । ' সোশ্যালিজম ' শব্দটি ১৮২৭ সালে ইংল্যান্ডের রবার্ট ওয়েন কো - অপারেটিভ ম্যাগাজিনে প্রথম ব্যবহার করেন ।

পরবর্তীকালে এই শব্দটির ব্যাপ্তি অনেককে প্রভাবিত করেছিল । সমাজতন্ত্র হল সাম্যবাদী সমাজের প্রথম পর্যায় । উৎপাদন পদ্ধতিতে সমাজতান্ত্রিক মালিকানা হল এর অর্থনৈতিক ভিত্তি । সমাজতন্ত্র ব্যক্তিগত মালিকানার উৎখাত ঘটায় এবং মানুষে মানুষে শোষণ , অর্থনৈতিক সংকট ও বেকারত্বের বিলোপ ঘটিয়ে উন্মুক্ত করে উৎপাদনী শক্তির পরিকল্পিত বিকাশ ।

ইতিহাস : সমাজতন্ত্রের ইতিহাসের উৎপত্তি ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লব এবং তার থেকে উদ্ভূত পরিবর্তনের ভেতরে নিহিত , যদিও এটি আগের আন্দোলন এবং ধারণা থেকে বিভিন্ন ধারণা গ্রহণ করেছে । প্রাচীনকাল থেকেই সমাজতান্ত্রিক মতেল এবং ধারণায় সমর্থন বিদ্যমান । প্লেটো , অ্যারিস্টটল , মাজদক প্রমুখগণের সমাজতান্ত্রিক চিন্তার উপাদান ছিল রাজনীতি । পরবর্তী ক্ষেত্রে ফ্রাঁসোয়া নোয়েল ব্যাবুফ , ফিলিপ বোনার্তি ফরাসি শ্রম ও সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন প্রভাবিত করেছিলেন । কার্ল মার্কস , রবার্ট ওয়েন , পিয়েরে জোসেফ প্রুধোঁ , জন স্টুয়ার্ট মিল প্রমুখ সমাজতান্ত্রিকরা অর্থনৈতিক সমাজতান্ত্রিকবাদের উপর আলোকপাত করেছিলেন ।

সমাজতন্ত্রবাদের প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্য :

  • এই ব্যবস্থায় কলকারখানা , জমি সম্পদ এবং উৎপাদনের অন্যান্য উপকরণের উপর রাষ্ট্রীয় মালিকানার স্বীকৃতি ।
  • এই অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় ব্যক্তিগত সম্পদ ও মুনাফা অর্জন নিষিদ্ধ , সম্পদ ও উৎপাদনের উপর রাষ্ট্রীয় মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হলে সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত হবে । ফলে সমাজে শ্রেণি বৈষম্য বিলুপ্ত হবে ।
  • এই ব্যবস্থায় শ্রমিকদের শোষণের কোন সুযোগ থাকে না , তাই শ্রমিক স্বার্থ সুরক্ষিত থাকে ।
  • সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতিতে মানুষের সকল মৌলিক চাহিদা যথা- খাদ্য , বস্ত্র , বাসস্থান , শিক্ষা , চিকিৎসা প্রভৃতির নিশ্চয়তা প্রদান করা হয় ।
  • সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় দ্রব্যের মূল্য পুঁজিবাদের ন্যয় চাহিদা ও জোগানের ঘাত প্রতিঘাত অনুযায়ী আপনা আপনি নির্ধারিত হয় না । কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ দ্রব্য সামগ্রীর দাম নির্ধারণ করে থাকে ।
  • এই ব্যবস্থায় রাজনৈতিক ব্যবস্থার মূল উপাদান হল রাষ্ট্র সমাজের নেতৃত্বজনিত ও চালিকা শক্তি মার্কসবাদী , লেনিনবাদী পার্টি , নানান সামাজিক সংগঠন ও মেহনতি কর্মী দল ।

সমাজে সমাজতন্ত্রবাদের ইতিবাচক প্রভাব :

  • তাত্ত্বিকভাবে জনসাধারণের স্বার্থের উপর ভিত্তি করে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে , যার প্রধান উদ্দেশ্য রাষ্ট্রীয় সম্পদ ।
  • যেহেতু সমস্ত কিছু সরকার কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত হয় তাই সম্পদ , শ্রম এবং জমির ব্যবহার যথাযথ হয়ে থাকে ।
  • এটি সমাজের নানা ক্ষেত্র ও সম্পদের বৈষম্য কমিয়ে দেয় ।
  • অপর্যাপ্ত উৎপাদন এড়ানো যায় ।
  • সমাজতন্ত্র অনেকাংশে বেকারত্বের মোকাবিলা করতে পারে ।

সমাজে সমাজতন্ত্রবাদের নেতিবাচক প্রভাব :

  • সমাজে রাজনৈতিক অত্যাচার ও আর্থিক দুর্ভোগ বৃদ্ধি পায় ।
  • গণতান্ত্রিক পুঁজিবাদ আরো সহজে প্রতিস্থাপিত হয় ।
  • সমাজ ও অর্থনীতিতে অদক্ষতা মাথাচাড়া দেয় ।
  • সামাজিক ইচ্ছার বিরুদ্ধে সমবায় পুলিং এর উপর অত্যধিক নির্ভরতা বৃদ্ধি পায় ।

সাম্যবাদ ও সমাজতন্ত্রবাদের তুলনা :

বৈশিষ্ট্য সাম্যবাদ সমাজতন্ত্রবাদ
মৌলিক দর্শন চাহিদা অনুযায়ী সক্ষমতা থাকে । ক্ষমতার জন্য অবদান থাকা উচিত ।
অর্থনীতির রূপায়ক কেন্দ্রীয় সরকার / কর্তৃপক্ষ । কেন্দ্রীয় সরকার / কর্তৃপক্ষ ।
অর্থনৈতিক সম্পদের মালিকানা সমস্ত অর্থনৈতিক সম্পদ হয় সর্বজনীন মালিকানাধীন এবং তা কোন ব্যক্তি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় না । ব্যক্তি মালিকানাধীন ব্যক্তিগত সম্পত্তি কিন্তু শৈল্পিক উৎপাদন ক্ষমতা সাম্প্রদায়িক মালিকানাধীন কিন্তু পরিচালিত হয় গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার দ্বারা ।
আর্থিক উৎপাদন বণ্টন মানুষের মৌলিক চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন হয় এবং তাদের প্রয়োজনানুযায়ী বিতরণ হয় । উৎপাদন হয় ব্যক্তিগত ও সামাজিক চাহিদা অনুযায়ী এবং বিতরিত হয় ব্যক্তিগত ক্ষমতা ও অবদান অনুযায়ী ।
শ্রেণি বৈষম্য শ্রেণির অস্তিত্ব থাকে না । অন্যের চেয়ে বেশি উপার্জন করার মানসিকতা প্রায় অস্তিত্বহীনতা । শ্রেণির অস্তিত্ব থাকে কিন্তু শ্রেণি বৈষম্য অনেকাংশে হ্রাস করা হয় ।
ধৰ্ম ধর্মীয় প্রভাব কার্যকরীভাবে লুপ্ত । ধর্মীয় স্বাধীনতার অনুমতি দেওয়া হয় ।
শাসন পদ্ধতি একক কমিউনিস্ট দলের আধিপত্য লক্ষ্য করা যায় । সাধারণত সমাজ তান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বিতা লক্ষ্য করা ।
প্রবর্তনের রীতি সশস্ত্র বিপ্লব দ্বারা প্রবর্তিত । গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক উপায়ে প্রবর্তিত ।


পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রবাদের তুলনা :

বৈশিষ্ট্য পুঁজিবাদ সমাজতন্ত্রবাদ
সম্পদের মালিকানা উৎপাদিত সম্পদ ব্যক্তিগত মালিকানাধীন । উৎপাদিত সম্পদের মালিকানা সরকার বা সমবায় ।
আয় সমতা আয় নির্ধারিত হয় মুক্ত / খোলা বাজার থেকে । আয় , চাহিদা অনুযায়ী বণ্টিত হয় ।
উপভোক্তা মূল্য চাহিদা ও জোগানের দ্বারা মূল্য নির্ধারিত হয় । মূল্য নির্ধারিত হয় সরকার দ্বারা ।
দক্ষতা ও উদ্ভাবন খোলা বাজারের প্রতিযোগিতা দক্ষতা ও উদ্ভাবনী ক্ষমতাকে উৎসাহিত করে । সরকারি মালিকানা নিয়ন্ত্রণাধীন ব্যবসা , দক্ষতা উদ্ভাবনী ক্ষমতাকে অনুপ্রেরণা দেয় ।
স্বাস্থ্য পরিষেবা ব্যক্তিগত মালিকানাধীনের আওতায় স্বাস্থ্য পরিষেবা থাকে । সরকার কর্তৃক বিনামূল্যে বা ভর্তুকিতে স্বাস্থ্য পরিষেবা প্রদান করা হয় ।
কর আরোপ ব্যক্তিগত আয়ের উপর ভিত্তি করে সীমিত কর আরোপ করা হয় । জনসাধারণকে পরিষেবা প্রদানের জন্য উচ্চহারে কর প্রদান করতে হয় ।
স্বাধীনতা ও সাম্য পুঁজিবাদে সাম্য ও স্বাধীনতার ওপর অধিক গুরুত্ব আরোপ করা হয় । সমাজতন্ত্রে স্বাধীনতার থেকেও সাম্যে অধিক গুরুত্ব প্রদান করা হয় ।

ফ্যাসিবাদ এবং ন্যাৎসিবাদ (Fascism & Nazism)

ফ্যাসিবাদ হচ্ছে আমূল কর্তৃত্বমূলক জাতীয়তাবাদের একটি রূপ যা বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে ইউরোপে খ্যাতিলাভ করেছিল । প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ইতালিতে ফ্যাসিবাদ উৎপত্তিলাভ করেছিল । ইতালিতে ১৯১৯-১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দ অবধি বেনিটো মুসোলিনী ( ১৮৮৩-১৯৪২ ) Fascismo নামে যে মতাদর্শ ও আন্দোলনের সূত্রপাত ও প্রচলন করেন করেন তাই হল ফ্যাসিবাদ ( Fascism ) । এটি বিশেষভাবে বামপন্থী রাজনীতির উপাদান গ্রহণের মাধ্যমে ডানপন্থী রাজনীতিতে অবস্থান গ্রহণ করে এবং এটি ছিল সমাজতন্ত্র , উদারতাবাদ , সাম্যবাদ , ডানপন্থী , রক্ষণশীল । এটি মূলত রাষ্ট্রের সকল মানুষকে একত্র করে একটি অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে ।

অপরদিকে নাৎসিবাদ হল রাজনৈতিক মতবাদ যা বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে জার্মানিতে উদ্ভূত হয়েছিল । নাৎসি পার্টির সঙ্গে এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে । এটি একধরনের ফ্যাসিবাদ বলে চিহ্নিত যার মধ্যে ' বৈজ্ঞানিক কৌলিবাদ ' ( Scientific Racism ) , ইহুদিবিদ্বেষ ( Antisemitism ) এর অন্তর্ভুক্ত । অ্যাডলফ হিটলারকে নাৎসিবাদের প্রবক্তা হিসাবে মনে করা হয় । ১৯৩৩ থেকে ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের পূর্বে পর্যন্ত এটা ছিল জার্মানির রাষ্ট্রীয় মতবাদ । জার্মানির ইতিহাসে এই সময়কে ' নাৎসি জার্মানি ' হিসাবে অবিহিত করা হয় ।

ফ্যাসিবাদ ও নাৎসিবাদের মধ্যে কিছু পার্থক্য :

ফ্যাসিবাদ নাৎসিবাদ
এটা মূলত ইতালিতে লক্ষ্য করা গেছে এটা মূলত জার্মানিতে লক্ষ্য করা গেছে
এর প্রধান পথিকৃৎ হলেন বেনিটো মুসোলিনী এর প্রধান পথিকৃৎ হলেন অ্যাডলফ হিটলার
এখানে সবকিছুর ঊর্দ্ধে রাষ্ট্র , অর্থাৎ এটি জাতীয়তাবাদের আক্রমণাত্মক রূপ এখানে রাষ্ট্রের ঊর্দ্ধে দলের প্রাধান্য রয়েছে
স্বজাতিকতা বা বর্ণবাদকে খুব একটা গুরুত্ব বা জোর দেওয়া হয়নি জাতির মধ্যে আর্য জাতিকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে । তারা অন্যান্য সম্প্রদায়কে ক্ষমতালাভের থেকে বঞ্চিত করেছিল
এটি অধিকতর কম চরমপন্থী ভাবাদর্শে বিশ্বাসী এটি অধিকতর চরমপন্থী ভাবাদর্শে বিশ্বাসী
হরতাল ও সন্ত্রাস সৃষ্টিকারী কমিউনিস্টদের দমন করার জন্য কালো পোশাক পরিহিত ক্যাডার নিয়োগ করা হয়েছিল । নাৎসি বিরোধী কমিউনিস্টদের হত্যা বা দমন করার জন্য ব্রাউনশার্ট ধারী সশস্ত্র দল নিয়োগ করা হয়েছিল
' ফ্যাসিবাদ ' শব্দটি ইটালিয়ান শব্দ ফ্যাসসিসমো ( Fascismo ) এর আদলে গ্রহণ করা হয়েছে ' নাৎসিবাদ ' শব্দটি জার্মান ভাষায় ' ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট জার্মান ওয়ার্কার্স পার্টি ' অনুকরণে গৃহীত হয়েছে

Thanks for your comment. We review and answer your comment.

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post